আজ: ১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার, ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৫ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি, সন্ধ্যা ৭:৪১
সর্বশেষ সংবাদ
মতামত বৈশাখের সাংস্কৃতিক আবহ এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গুরুত্বঃ

বৈশাখের সাংস্কৃতিক আবহ এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গুরুত্বঃ


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ অনলাইন | প্রকাশিত হয়েছে: ১৪/০৪/২০২২ , ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: মতামত


হিজরী সন গণনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে প্রথম জন্মদিনে যার বয়স ছিল ৯৬৩ বছর, সেই বাংলা নববর্ষের প্রবর্তন কোন বাঙালীর দ্বারা হয়নি। বাংলা সনের প্রবর্তক সম্রাট আকবর (১৫৪২-১৬০৬ খ্রি.) বাংলা ভাষা জানতেন না। তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন চেঙ্গিস খাঁ আর তৈমুর লং-এর বংশধর। যারা বাংলা নববর্ষের সঙ্গে হিন্দুয়ানির গন্ধ খোঁজেন তাদের জানা উচিত এর সঙ্গে হিন্দুত্ব বা মুসলমানিত্বের কোন সম্পর্ক নেই। আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল তাঁর বিখ্যাত ‘আকবরনামা’য় চন্দ্রকেন্দ্রিক তারিখ গণনায় কৃষকদের বিড়ম্বনার বিবরণ দিয়ে সূর্যকেন্দ্রিক ঋতুভিত্তিক তারিখ গণনা কিভাবে কৃষকের জন্য যৌক্তিক তার ব্যাখ্যা দেন। মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর হিজরী সন অনুযায়ী কৃষি খাজনা আদায় করা হতো। অসময়ে খাজনা দেয়া কৃষকদের জন্য কঠিন ছিল। সম্রাটের আদেশমতো তৎকালীন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেউল্লাহ সিরাজী সৌর সন ও আরবী হিজরী সনের ওপর ভিত্তি করে বাংলা সন ও তারিখ নির্ধারণ করেন। পুরো কাজটাই করা হয় ফসল উৎপাদনের ঋতুচক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। কৃষিতে সেচ ও প্রযুক্তির ব্যবহার না থাকায় আজকের মতো বারো মাস ফসল তথা ধান উৎপাদনের সুযোগ এ অঞ্চলে ছিল না। কৃষি ছিল প্রকৃতি বা ঋতুনির্ভর। দেখা যেত জমিদারের লোক যখন খাজনা নিতে আসত কৃষক তখনও ফসল কাটা শুরু করেননি। এছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের পূজা-পার্বণ সৌরবর্ষ অনুযায়ী পালিত হলেও সরকারী কাজকর্মে চন্দ্রভিত্তিক হিজরী সন প্রচলিত থাকায় এ অঞ্চলের হিন্দুরা এর একটি সমন্বয় দাবি করেছিলেন সম্রাটের নিকট। আসলে আকবর প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনেন। বাংলা মাসগুলোর নাম রাখা হয় নক্ষত্রের নামানুসারে। শুরুতে তারিখ-ই-এলাহীতে মাসের নামগুলো ভিন্ন ছিল। মাসের দিনগুলোর জন্য ৩১টি পৃথক নাম ছিল। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় পৃথিবীর অন্যান্য পঞ্জিকার সপ্তাহ গণনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সপ্তাহের ৭ দিনের নামকরণ করা হয়। এখানেও গ্রহ-নক্ষত্রের নামানুসারেই দিনগুলোর নামকরণ করা হয়। দুর্ভাগ্য হচ্ছে যারা ভারতবর্ষে মুসলমানদের বিশেষ করে মুঘলদের শাসন নিয়ে গর্ব করেন বা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু অধ্যুষিত ভারতবর্ষে মুসলমানদের বিজয়গাথা হিসেবে উচ্ছ্বসিত হন তাঁরাই তাঁদের প্রিয় সম্রাট মহামতি আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত বাংলা সনকে হিন্দুদের ঐতিহ্য বলে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের বিরোধিতা করেন।চৈত্র মাসের শেষ দিন ছিল জমিদারের খাজনা আদায়ের শেষ দিন। ইতিহাসের সাক্ষ্য, খাজনা পরিশোধের বিড়ম্বনা সে আমলের বড় আর্থরাজনৈতিক সমস্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক। নাটক-সিনেমায় যেমনটি দেখা যায় বাস্তবেও ছিল তাই। দরিদ্র কৃষক খাজনা মওকুফ কামনায় তাদের সবচেয়ে জরাজীর্ণ পোশাক পরেই জমিদারের দরবারে হাজির হয়ে পায়ে ধরে খাজনা মওকুফে ভিক্ষা চাইতেন। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি হলে অভুক্ত কৃষক জীর্ণ শরীর প্রদর্শনের জন্য গায়ে কোন কাপড়ই পরতেন না। ভূমিহীন বর্গাচাষীদের জন্য দিনটি ছিল আরও দুর্বিষহ। খাজনা আদায়ের নিপীড়ন বিড়ম্বনা এবং সৃষ্ট তিক্ততা প্রশমনের উদ্দেশ্যে সম্রাট খাজনা আদায়ের পরের দিনটিকে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা দিয়ে উৎসবে পরিণত করেন। প্রচলিত অনেক অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে আকবর নতুন উৎসব চালু করেন। এর মধ্যে নববর্ষের উৎসবটি অন্যতম। চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে খাজনা পরিশোধ উপলক্ষে উৎসবের আয়োজন করা হতো। এতে থাকত নাচ, গান, যাত্রাপালা, মেলা, গরু ও ঘোড় দৌড়, মোরগযুদ্ধ, ষাঁড়ের লড়াই, নৌকাবাইচ ইত্যাদির আয়োজন।
আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের শুরু ১৯১৭ সালে, প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে বৈশাখে কীর্তন-ভজন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয় ভারতবর্ষে। এরপর ১৯৩৮ সালে অনুরূপ অনুষ্ঠানের খবর পাওয়া যায়। শান্তিনিকেতনে আশ্রম যুগ থেকেই বাংলা বর্ষ বিদায় তথা চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ নববর্ষ পালন শুরু হয়। নববর্ষের পর আশ্রমে গ্রীষ্মকালীন ছুটি শুরু হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম বৈশাখে। বৈশাখ নিয়ে অনেক গান, কবিতা লিখেছেন বিশ্বকবি। ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ’… ছাড়া বাঙালীর নববর্ষ ভাবা যায় না। রবীন্দ্রনাথের নটরাজ গ্রন্থে প্রকাশিত গানটির রচনাকাল ২০ ফাল্গুন ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ। ১৬০৮ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশনায় সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতি যখন ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করলেন তখন থেকেই এখানে রাজস্ব আদায় এবং বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশের শুরুর দিন হিসেবে পহেলা বৈশাখ উৎসবের দিনরূপে পালন শুরু হয়। সম্রাট আকবরের অনুকরণে সুবেদার ইসলাম চিশতি তাঁর বাসভবনের সামনে প্রজাদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ ও বৈশাখী উৎসব পালন করতেন। এই উপলক্ষে খাজনা আদায় ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি চলত মেলায় গান-বাজনা, গরু-মোষের লড়াই, কাবাডি খেলা। মিটফোর্ডের ভাওয়াল রাজার কাছারিবাড়ি, ঢাকার নবাবদের আহসান মঞ্জিল, ফরাশগঞ্জের রূপলাল হাউস, ওয়াইজঘাটের নীলকুঠির সামনে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠান হতো। ঢাকায় পহেলা বৈশাখ বলতে পুরান ঢাকার উৎসবই ছিল, অন্য কোথাও কিছু ছিল না। কালের বিবর্তনে এখন পুরান ঢাকার উৎসবগুলো ঢাকার অন্যত্র চলে গেছে। অবশ্য বিগত ৩ বছর যাবত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে আশপাশের ৭০-৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পুরান ঢাকার নববর্ষ উদযাপনের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার ব্যাপক আয়োজন শুরু হয়েছে।১৯৬০-এর দশক থেকে বাঙালীর বর্ষবরণ উৎসব পরিণত হয় প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। ভূগোল ও ইসলামের দ্বন্দ্ব নিয়ে সৃষ্ট পাকিস্তানের অখ-তা রক্ষার ব্যর্থ চেষ্টা হিসেবে শুরু হয় আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর একের পর এক আক্রমণ। পাকিস্তানীরা বাঙালীদের বরাবরই হিন্দু প্রভাবিত নিচু জাতের মানুষ ভাবত। বাঙালী সংস্কৃতি ও ভাষার সঙ্গে হিন্দুত্বকে জড়িয়ে ফেলত। বাংলা ভাষায় উর্দু ও আরবী শব্দের জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে হিন্দুয়ানি বাংলাকে মুসলমানিকরণের আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ঠিকই বুঝতে পেরেছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালী সংস্কৃতি ও স্বকীয়তার অনন্ত প্রেরণার উৎস। তাই রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করে পাকিস্তানী শাসক আইয়ুব খান। রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্র সঙ্গীত ও কবিতার প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। ভারত থেকে বাংলা বই ও চলচ্চিত্র আমদানিও নিষিদ্ধ করা হয়। ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৬৬-র ৬ দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো রবীন্দ্রনাথকে পূর্ব পাকিস্তানে নিষিদ্ধ করা আমাদের জাতীয়তা বিকাশে তথা বাঙালীর স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনাগুলোর একটি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাঙালীর সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে এবং তাদের প্রতিবাদের একটি অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায় ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব বৈশাখ উদযাপন। ১৯৬১ সালে পূর্ব বাংলায় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপিত হয়। একই বছর প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। এসব প্রতিবাদী আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রবীন্দ্রনাথের ‘এসো হে বৈশাখ’ দিয়ে শুরু হয়েছিল নতুনরূপে বাঙালীর প্রাণের উৎসব বৈশাখ উদযাপনের পথচলা। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গবন্ধুর বাঙালী মানসে তথা স্বতন্ত্র জাতিসত্তার ভাবনায় কিভাবে প্রেরণা জুগিয়েছিলেন তার একটি উদাহরণ হলো- ১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ ঢাকার মতিঝিলস্থ ইডেন হোটেলে বাঙালীর স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের ৩ দিনব্যাপী কাউন্সিল অধিবেশনের উদ্বোধন হয়েছিল ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি…’ গানটির মধ্য দিয়ে। আওয়ামী লীগের এই কাউন্সিলেই আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। বাঙালীর যা কিছু অর্জন তার নেতৃত্বে বরাবরই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে পহেলা বৈশাখে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গিয়ে উদ্যোক্তারা বিরূপ সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। বলা হয়েছিল পাকিস্তানী সংস্কৃতির বরখেলাপ করে হিন্দুয়ানি (বাঙালী) সংস্কৃতির আমদানি হচ্ছে। পাকিস্তানপন্থীরা আসলে বিষয়টি ঠিকই অনুধাবন করতে পেরেছিল ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের মতো পহেলা বৈশাখ পালনও পাকিস্তানের অখ-তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে এবং বাঙালীর স্বকীয় চেতনা বিকাশে বড় অবদান রাখবে। রবীন্দ্রসাহিত্য ও সঙ্গীতচর্চা বন্ধ করার পেছনেও উদ্দেশ্য ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদী ধারাকে ধ্বংস করা। একুশের চেতনার মতো নববর্ষ উদযাপনও বাঙালী জাতীয়তাবাদকে শাণিত করতে ভূমিকা রাখবে এটা পাকিস্তানীরা যেমনটা বুঝেছিল, তেমনি ইসলাম আর পাকিস্তানকে এক করে যারা দেখে এমন বাঙালীরও (বাংলাদেশী) অভাব ছিল না।পাকিস্তানী এবং তাদের সমমনা এ দেশীয় দোসরদের বিরোধিতার মধ্য দিয়েই আয়োজন শুরু হয় প্রতিবাদী বৈশাখ উদযাপন, যার নেতৃত্ব দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বাধা এলে অতিক্রমের প্রয়াস আরও জোরালো হয়। পহেলা বৈশাখ পরিণত হয় বাঙালীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ারে। ষাটের দশকে ঢাকায় উৎসবের চেয়ে প্রতিবাদের অনুষ্ঠান ছিল বৈশাখ। ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়েই বৈশাখের পুনঃজাগরণ ঘটে। বাঙালীর আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের নতুন যাত্রার শুরু থেকে যারা অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন তাদের অন্যতম ওয়াহিদুল হক এবং ড. সনজিদা খাতুন। সনজিদা খাতুন এখনও ছায়ানটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রয়াত ওয়াহিদুল হকের একাধিক বক্তৃতায় বৈশাখ উদযাপনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসামান্য ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই ১৯৭২ সালে পহেলা বৈশাখ সরকারী ছুটি ঘোষণা করেন এবং এটাকে জাতীয় উৎসব হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

বাংলা নববর্ষকে বাঙালীর সার্বজনীন বৃহত্তম উৎসবে পরিণত করতে আশির দশকের শেষের দিকে সর্বপ্রথম চারুকলা ইনস্টিটিউটের নেতৃত্বে শুরু হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ চারুকলার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এবং মনেপ্রাণে বাঙালিয়ানা ধারণকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নেতৃত্বে এর সূচনা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক হিসেবে মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। মঙ্গল শোভাযাত্রার পেছনেও রাজনীতি ছিল। সামরিক স্বৈরশাসন এবং মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জোরালো একটি মাধ্যম হিসেবেই মঙ্গল শোভাযাত্রার ধারণাটিকে আমরা সামনে নিয়ে আসি। এক্ষেত্রে আমরা অকুণ্ঠ সমর্থন ও সার্বিক সহযোগিতা পেয়েছিলাম বাঙালী সংস্কৃতির অন্যতম পথিকৃৎ জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে। মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে যারা যুক্ত ছিলাম সবাই সামরিক শাসক ও তার পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত মৌলবাদী শক্তিকে পর্যুদস্ত করার ভাবনা থেকেই বড় বড় অস্থায়ী ভাস্কর্য নিয়ে শোভাযাত্রার পরিকল্পনা করি। শুভ-অশুভের প্রতিদ্বন্দ্বিতা উপস্থাপিত হয় বিশাল আকৃতির অজগর, হাতি, বাঘ, টিয়া, পেঁচা, প্রজাপতি, কবুতর বিভিন্ন প্রাণীর প্রতীকী ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় স্থান করে নেয় বাঙালী ঐতিহ্যের লাঙল-জোয়াল, মই, চরকা, ঢেঁকি, পালকি, মাছ ধরার উপকরণসহ বস্তুগত সংস্কৃতির উপকরণাদি। প্রতি বছরের মূল প্রতিকৃতির পেছনে একটি থিম কাজ করে। পেটাপুতুল থেকে শুরু করে জীবজন্তুর প্রতিকৃতি নিয়ে শোভাযাত্রার বিরোধিতাও কম হয়নি। অনেক প্রতিবন্ধকতা ও সমালোচনা অতিক্রম করেই আজকের সার্বজনীন মঙ্গল শোভাযাত্রা। মৌলবাদীরা প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করে। হেফাজতের চৌদ্দ দফার দাবির ১১ নং দফাটি মঙ্গল শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করা। এমনকি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যারা বরাবরই চিন্তা-চেতনায় মৌলবাদীদের সমর্থক তাদের অনেকেই মঙ্গল শোভাযাত্রার নতুন রূপটিকে বাঙালী সংস্কৃতির ঐতিহ্যের অংশ নয় বলে বিরোধিতা করে। কিছু লোক মনে করে সংস্কৃতি একটি আবদ্ধ কুয়া, যাতে নতুন কিছু ঢুকলে পানি দূষিত হয়ে যাবে। তারা একবারও ভাবে না কুয়ার চারদিক বন্ধ করে রাখলে এর পানি প্রাকৃতিক নিয়মেই দূষিত হয়ে পড়বে। সংস্কৃতিতে যদি নতুন নতুন উপাদান যুক্ত না হয় তাহলে সে সংস্কৃতি নিজ থেকেই মরে যাবে।১৪২৩ নববর্ষের নতুন মাত্রা হচ্ছে বাঙালিত্বের সেরা পৃষ্ঠপোষক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক নববর্ষের ভাতা প্রবর্তন। বাঙালীর জীবনে এটাই প্রথম সার্বজনীন অসাম্প্রদায়িক কোন উৎসবভাতা, যা সরকারী কর্মচারীদের দেয়া হয়েছে। মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে নববর্ষ ভাতা নতুন স্কেলে এ বছর সবাই পেয়েছেন, যদিও অন্যান্য ভাতা পাচ্ছেন পুরনো স্কেলে। কেবল এ খাতেই সরকারের ৬০০ কোটি টাকার মতো ব্যয় হবে। বেসরকারী খাতে ইতোমধ্যে এ ভাতা চালুর ঘোষণা এসেছে অনেক লাভজনক ও কর্মীবান্ধব প্রতিষ্ঠান থেকে। জনপ্রিয় দাবি ও বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অন্যরাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন নববর্ষ ভাতা চালুর। কয়েক বছরের মধ্যে ওই ভাতার পরিমাণ ও পরিধি বিস্তৃত হবে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। যদিও দ্রুত এ হিসাব মিলানো কঠিন। এর প্রভাব আমরা অচিরেই দেখতে পাব। এই ভাতা আমাদের অর্থনীতিতে গুণিতক প্রভাব ফেলবে।শুধু পোশাক, জুতা, প্রসাধনীই নয়, ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায় মৃৎশিল্প, বাঁশ ও বেতের সামগ্রীতে; মুখোশ, দেশী খেলনা, বাদ্যযন্ত্র, বাঁশি, ঢোল, প্লাস্টিক সামগ্রী শিল্পে। এগুলো প্রায়ই আমাদের মৃতপ্রায় কুটির শিল্প। এদের অনেকেরই ব্যবসা নববর্ষকেন্দ্রিক। দেশী পণ্যের বাজার চাঙা করতে বিরাট অবদান রাখছে পহেলা বৈশাখ। বৈশাখ আয়োজনের আনুষঙ্গিক উপকরণÑ পোশাক থেকে শুরু করে খাবার-দাবারে প্রায় সকল উপাদানই দেশীয়। দেশের অর্থনীতিতে এ দিবসটির বর্তমান অবদান ঈদ উৎসবের কাছাকাছি।

লেখক: ড.মীজানুর রহমান,
অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।

Comments

comments

Close