আজ: ২৯শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার, ১৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৩ হিজরি, সকাল ৮:৩৩
সর্বশেষ সংবাদ
জেলা সংবাদ পুতুল নাচের জন্মপীঠে পুতুল নাচের আসর

পুতুল নাচের জন্মপীঠে পুতুল নাচের আসর


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ২১/০৩/২০২২ , ৭:২১ অপরাহ্ণ | বিভাগ: জেলা সংবাদ


শুভ চক্রবর্ত্তী, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি :

হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির ধারক পুতুল নাচ। ভারতীয় উপমহাদেশে পুতুল নাচের এই অনন্য শিল্পটির প্রবর্তক ওস্তাদ বিপিন দাস (১৮৭৯-১৯৭৮)। তাঁর জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়া (তৎকালীন মহকুমা) জেলার নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের গয়না নৌকা ব্যবসায়ী বৃন্দাবন দাস ও তুলসী বালার ঘরে। শৈশব-কৈশোরে মাটির তৈরি পুতুল-খেলনার প্রতি তার ঝোঁক ছিলো প্রবল। সেই থেকে পুতুল দিয়ে নাচ গানের স্বপ্ন জাগে কিশোর বিপিন দাসের মনে। সেই ঘোর থেকেই তিনি তৈরি করে ফেলেন স্টিক পুতুল, স্প্রিং পুতুল, সূতোর তৈরি ভিন্ন ধরনের পুতুল। গানের তালে তালে গ্রামীন জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রচলিত নানান আখ্যান-উপাখ্যান, লোকজ সাহিত্য- সংস্কৃতি উপস্থাপনার সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র ও সুরের মূর্ছনায় পুতুলের নৃত্যের শৈল্পিক প্রদর্শনী সাড়া  ফেলে দেয় সমগ্র অঞ্চলে। এরপর থেকেই পুতুল নাচের আসর হয়ে উঠে গ্রামীণ জনপদে শিশু-কিশোর ও সর্বস্তরের মানুষের বিনোদনের মাধ্যম। শহরাঞ্চলেও পুতুল নাচের প্রদর্শনী হয়ে উঠে জনপ্রিয়তার শীর্ষে । বিপিন দাসের পুত্র ও শিষ্যদের হাত ধরে পুতুল নাচের শৈল্পিক প্রদর্শনীর বিস্তার ঘটে অবিভক্ত ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলে। জনশ্রুতি আছে, কাবুল পর্যন্তও এই শিল্পের বিস্তার ঘটে ছিলো। এই শিল্পে প্রভাবিত হয়েই বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় “পুতুল নাচের ইতিকথা” শিরোনামে সৃষ্টি করেন তাঁর অমর উপন্যাস। ‘পুতুল নাচ’র এই শিল্পের প্রবর্তন ও প্রসারে অসামান্য অবদানের জন্য ভারতের রাষ্ট্রপতি পদক, পদ্মভূষণ পদক, বিশ্বভারতী পদক সহ সুনামধন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে মরণোত্তর নানান পদকে ভূষিত হয়েছিলেন ওস্তাদ বিপিন দাস।

“কালের ভারে পুতুল নাচ”  প্রদর্শনীর এই শিল্পটির প্রদর্শন কমে গেলেও, বংশপরম্পরায় ওস্তাদ বিপিন দাসের উত্তরাধিকারীরা সহ বেশ কিছু সংগঠন এই শিল্পকে ধরে রেখেছেন। অত্র এলাকা পুতুল নাচের জন্মপীঠ হলেও এই শিল্পের প্রদর্শনী এখানে খুবই কম হয় ,  এমনটাই বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত মুক্তির উৎসব ও সুবর্ণজয়ন্তী মেলা-২০২২ এ পুতুল নাচ প্রদর্শন করতে আসা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের পুতুল নাচ শিল্পের দিকপাল ধন মিয়ার প্রতিষ্ঠিত, পঞ্চাশ বছরেরও অধিক পুরোনো, ২০১৩ সালে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত পাপেট কার্নিভালের চ্যাম্পিয়ন হওয়া পুতুল নাচ প্রদর্শনীর শ্রেষ্ঠ সংগঠন, “রয়েল বিণা” এর পরিচালক মোহাম্মদ শামীম মোল্লা।

রবিবার (২১ মার্চ) সন্ধ্যা রাতে নবীনগর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পুতুল নাচ প্রদর্শনীতে অংশ নেন ‘রয়েল বিণা’ সংগঠনটির বর্তমান কর্ণধার ধন মিয়ার পুত্র মোঃ শামীম মিয়া আরো অংশ নেন হারমোনিয়াম মাস্টার হাবিব মিয়া, ঢোল বাদক সন্তোষ দাস, কর্তাল বাদক টিটু বিশ্বাস এবং এই পুতুল নাচ আসরের সার্বিক নির্দেশনায় ছিলো সংগঠনটির পরিচালক মোহাম্মদ শামীম মোল্লা।

এই প্রদর্শনীতে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনের বিভিন্ন ঘটনা, নদী কেন্দ্রিক বাঙালির জীবনধারা, কাঠুরিয়ার বনে কাঠ কাটতে গিয়ে বাঘের হাতে প্রাণ হারানো, সাপুরে, কৃষি কাজ, জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড প্রভৃতি গ্রামীণজন জীবন ও লোকজ সংস্কৃতির নানান দিক ফুটে উঠে।

পুতুল নাচ উপভোগ করতে আসরে উপস্থিত ছিলেন নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একরামুল ছিদ্দিক, নবীনগর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিক মোঃ আবু মোছা, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক ও নবীনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি সঞ্জয় সাহা, প্রাক্তন সংবাদকর্মী গোলাম হোসেন সহ স্থানীয় মান্যবর ব্যক্তিবর্গ ও অগণিত দর্শনার্থী।

Comments

comments

Close