আজ: ২২শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২১শে শাওয়াল, ১৪৪৩ হিজরি, রাত ১:৫৬
সর্বশেষ সংবাদ
জেলা সংবাদ ডাঃ কামরুন্নাহার ও মিশন হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাল্লা ভারী

ডাঃ কামরুন্নাহার ও মিশন হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাল্লা ভারী


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ২০/০৩/২০২২ , ৮:৩৪ অপরাহ্ণ | বিভাগ: জেলা সংবাদ


ই এম আসাদুজ্জামান আসাদ :   রাজধানী ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ৪দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর গতকাল ১৯ মার্চ জেনারেল ওয়ার্ডে আনা হয়েছে প্রসূতি সৈয়দা নিহা’কে। তবে এখনো নবজাতক পায়নি মায়ের স্পর্শ, মা পায়নি কাছে পায়নি সন্তানকে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিশন হাসপাতালের ডাঃ কামরুন্নাহারের ভুল চিকিৎসার কারণে মূমূর্ষ অবস্থায় গত ১৫ মার্চ ঢাকা পাঠানোর পর থেকে গতকাল পর্যন্ত প্রসূতি নিহা ছিলেন লাইফ সাপোর্টে আর তার নবজাতক শিশুটি রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দাদা-দাদির কাছে।
ঢাকা স্কয়ার হাসপালের ডাক্তারগণ জানান, যখন নিহাকে এখানে আনা হয়েছিল তখন তার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তাকে আরো আগে নিয়ে আসতে পারলে ভালো হতো। তবে এখন আর ভয়ের কিছু নেই। বয়স কম হওয়ায় ধীরে ধীরে রিকভার করে নিতে পারবেন নিহা। তবে এই ঘটনায় ডাঃ কামরুন্নাহার কিংবা মিশন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেউই কথা বলতে রাজি নন।
ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালে অবস্থান করা প্রসূতি নিহার ভাগিনা নাহিয়ান আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যরা জানান, ডাক্তারের ভুলে নিহা অসুস্থ হওয়ার পর হেলিকপ্টার এর কথা বলে ৩-৪ ঘন্টা দেরী করে মিশন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অবশেষে মূমূর্ষ অবস্থায় নিজেরাই এম্বুলেন্সে করে নিয়ে আসেন ঢাকায়। কিন্তু মিশন হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসার পর থেকে এখন অব্দি ডাক্তার কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেউই রোগীর খোঁজ নেননি। রোগী সুস্থ্য হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিরে ডাক্তার ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিবেন বলেও জানান তারা।
এদিকে এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে চলছে প্রতিবাদের ঝড়। ডাঃ কামরুন্নাহার এবং মিশন হাসপাতালের বিরুদ্ধে যেন অভিযোগের শেষ নেই। এই বিষয়ে ভুক্তভোগী প্রায় শতাধিক মানুষ প্রতিবেদকের ইমেইল, ইনবক্সে, ফোনকল সহ সরাসরি ফেইসবুক পোস্টে মন্তব্য করে তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় বাসিন্দা এমন কিছু ভুক্তভোগীর অভিযোগ হুবহু তুলে ধরা হলো,
নবীনগর উপজেলার মোঃ জুবায়ের এক মন্তব্যে জানান, ‘কামরুন্নাহার একটা ফালতু ডাক্তার। আমার ভাতিজীরও মৃত্যু হয় তার ফালতু চিকিৎসার কারণে। পরেরদিন আরেকটা বেবীর মৃত্যু হয় তার হাতে। তার নামটা শুনলেই মেজাজ গরম হয়ে যায়।’
জেলা শহরের নাদিয়া আক্তার জানান, ‘এটার একটা বিহিত হওয়া দরকার ।সবচেয়ে লজ্জা জনক হচ্ছে অপারেশন রুমে পুরুষ ডাক্তার যখন থাকে।আর উনিও একজন মহিলা হয়ে এটা এলাও করে।’
তাবাসসুম পিংকি জানান, ‘ওই ঘটনার সময় আমিও  হসপিটালে ছিলাম। পেশেন্টের কষ্ট দেখে এখনো মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, অবস্থা খারাপ এডভান্স ১ লক্ষ টাকায় হেলিকপ্টার আসবে।’
আবু আইয়ুব নামে একজন অভিযোগ করে বলেন, ‘উনার ভূলের কারণে আমার সন্তান মারা গেছে।’
জাহিদ হাসান নামে একজন জানান, ‘ডাঃ কামরুন নাহার নাম শুনলেই মেজাজে চরম হারাপ হইয়া যায় । আমাকেও ছেলে হারা বানাইছে ওকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক’।
রুবেল মিয়া নামে একজন জানান, এই মিশন হাসপাতালের সাথে যারা জড়িত সব শালার ডাকাতি করে, মিশনের ফার্মেসী থেকে গত সপ্তাহে আমার স্ত্রীর জন্য একটা নরমাল ইনজেকশনের দাম রাখছে ১০০ টাকা। আমি বাহিরের ফার্মেসী থেকে কিনছি মাত্র   ২৫টাকা। মিশনের পরিচালক সহ সবগুলোকে জেলে ঢুকানো দরকার।  প্রথম অবস্থায় ডাক্তার কামরুন্নাহার রোগীকে বলে মা তুমার বাচ্চা নরমাল হবে, ডেলিভারীর সময় যখনই এগিয়ে আসে তখন বলে সীজার করতে হবে। ওয়ার্ড বলেন,  কেবিনে বলেন তারা তাদের চাহিদা মতো রোগীর বিলের কাগজটা গার্ডিয়ানের হাতে তুলে দেয় ,১ টাকা পযর্ন্ত শালারা কম রাখেনা।
মোঃ সাইফ আলী জানান,’মিশনে নরমাল ডেলিভারী বলতে কোন শব্দ নাই। গেলেই এই সমস্যা ওই সমস্যা বলে ভয় দেখিয়ে সিজার করাবেই।’
এর আগেও অভিযোগ জানিয়েছিলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক সৈয়দ সানি । তিনি বলেন,  বিচার চাই..
চিকিৎসকের নামে একজন ব্যবসায়ী কামরুন্নাহার বাধ্য করাই মানুষকে সিজার করাতে.. ৯ মাস আল্ট্রা নিজেও করাবো কমিশনে বাহির হাসপাতালে পাটাবে লাষ্ট আওয়ারে বলবে কন্ডিশন ভালো না সিজার জুরুরি। সিজার রুমে মহিলাদের শীলতাহানি হয়…পুরুষ মহিলা উপস্হিতিতে বাজে রুপে সিজার করানো হয়.. আবার নিজে সুরুত ধরে মৌলভীর।
জেলা ছাত্রলীগ নেতা শাহরিয়ার হোসেন রাশেদ জানান, এটার বিরুদ্ধে আমরা মিছিল করেছিলাম। শালারা জানোয়ার।
তানিয়া সুলতানা নামে একজন জানান, এই মহিলার একটা ব্যাবস্থা হওয়া উচিৎ।  আমি ৪ ঘন্টা মিশনে ছিলাম তাও একটা বার এসে দেখে নি আমাকে।  উল্টো আমার পরিবারকে ধমকাইছে।
নোঙর এর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সভাপতি শামিম আহমেদ জানান,কয়েকটি ঘটনা চোখের সামনে ঘটেছে। ডাঃ কামরুন্নাহারের নাম শুনলেই মেজাজ খারাপ হয়।
তামান্না আক্তার নামে একজন জানান, এর আগেও আমার এক আন্তীয়র নবজাতক শিশু  এই ডাক্তারের ভুলে মারা যায়।
ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও কেন ডাক্তারের বিরুদ্ধে যথাযথ অভিযোগ করেনি? কয়েকজন ভুক্তভোগীর কাছে এই প্রশ্নের জবাব জানতে চাইলে তারা বলেন, “ডাক্তারের শাস্তি হবে একটু ভর্ৎসনা বা নরমাল সতর্ক করে ছেড়ে দেবে। কিন্তু আমার যে আর্থিক, মানসিক, পারিবারিক ক্ষতি এর ক্ষতিপূরণ কে দেবে? আর একজন ডাক্তারের বিরুদ্ধে আরেকজন ডাক্তার তদন্ত করে কী শাস্তি দেবে? আমিতো কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাব না। এজন্য আমি যাইনি।”
অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও কেন ডাক্তার কিংবা হাসপাতালের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়না? এমন প্রশ্নের জবাব জানতে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর একমাত্র প্রতিষ্ঠান বিএমডিসির সাথে যোগাযোগ করলে তারা জানান, আমাদের দেশে অনেক সময় ভুল চিকিৎসা, ডাক্তারের অবহেলা এবং গাফিলতির নানারকম অভিযোগে হাসপাতাল ভাঙচুর, কর্তব্যরতদের মারধরের ঘটনা ঘটছে কিন্তু এক্ষেত্রে যথাযথ নালিশ জানানোর জন্য যে সংস্থা রয়েছে সেখানে অভিযোগ করছেন খুবই কম সংখ্যক মানুষ। আর তাই প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে কোন ব্যবস্থা নেয়া যায় না।
বিএমডিসির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লার সাংবাদিকদের দেয়া এক সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, “রোগী না মারা গেলেও এরকম যদি মনে করেন যে তিনি ভুল চিকিৎসার শিকার বা তার আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন তাহলে অভিযোগ দিতে পারেন। আমরা তদন্ত করে যদি মনে করি যে চিকিৎসকের ভুল ছিল বা তার আরো সতর্ক হওয়া দরকার ছিল তাহলে আমরা তাকে সতর্ক করতে পারি। তীরষ্কার করতে পারি। সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে তার নিবন্ধন স্থায়ীভাবে বাতিল করতে পারি। তবে ক্ষতিপূরণের জন্য ভুক্তভোগী চাইলে আদালতে যেতে পারেন।”
এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা: মোহাম্মদ একরাম উল্লাহর কাছে জানতে চাইলে তিনি দৈনিক মতপ্রকাশকে বলেন, মিশন হাসপাতাল এবং ডাক্তার কামরুন্নাহারের ব্যাপারে অভিযোগ গুলো হয়ত আমি আসার আগের। আমি আসার পর এমন কোন অভিযোগ পায়নি। লিখিত অভিযোগ না পেলে আমরা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারিনা। লিখিত অভিযোগ পেলে নিয়ম অনুযায়ী ডাক্তার ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ১৪ মার্চ মিশন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পরামর্শে চিকিৎসক কামরুন্নাহার এর সাথে ২৫ হাজার টাকায় নরমাল ডেলিভারির চুক্তির পর ওই ক্লিনিকে ভর্তি হোন ভুক্তভোগী নিহা। গতকাল ১৫মার্চ সকালে নরমাল ডেলিভারির সময় চিকিৎসকের ভুলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হলে, রুগীকে ৩বার অপারেশন করেন চিকিৎসক। কিন্তু তবু রক্তক্ষরণ বন্ধ না হলে চিকিৎসক পালিয়ে যান।
পরে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ উপায় না পেয়ে রোগীকে দ্রুত হেলিকপ্টার করে পাঠানোর কথা বলে। কিন্ত ৩ঘন্টায়ও হেলিকপ্টারের কোন খবর হয়নি। পরে রোগীর স্বজনরা নবজাতক শিশুকে মিশন হাসপাতাকে রেখেই এম্বুলেন্সে করে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা পাঠান।

Comments

comments

Close