আজ: ২১শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২০শে শাওয়াল, ১৪৪৩ হিজরি, রাত ৩:১০
সর্বশেষ সংবাদ
জেলা সংবাদ, প্রধান সংবাদ কুষ্টিয়ায় শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী লালন সাঁইজির স্মরণ উৎসব

কুষ্টিয়ায় শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী লালন সাঁইজির স্মরণ উৎসব


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ১৪/০৩/২০২২ , ১০:২৬ অপরাহ্ণ | বিভাগ: জেলা সংবাদ,প্রধান সংবাদ


জেলা প্রতিনিধি:করোনা মহামারির কারণে সরকারি নিষেধাজ্ঞায় ২০২০ সালের পরে টানা দুই বছর কুষ্টিয়ায় ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ্ এর আখড়াবাড়িতে ছিল না লালন স্মরণোৎসব ও লালন তিরোধান দিবসে কোনো আয়োজন। সাধু ভক্তদের মিলন মেলায় করোনার কারণে পড়ে ছিল ভাটা। মহামারির সংকট কাটিয়ে এবারে আবারও কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় বসছে দোলপূর্ণিমা উপলক্ষ্যে লালন স্মরণোৎসব ।  এবারে সাংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তিন দিনের লালন স্মরণোৎসবের আয়োজন করেছে কুষ্টিয়ার লালন একাডেমি।মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ্ এর এই আধ্যাত্মিক বাণীর স্লোগানে মঙ্গলবার (১৫ মার্চ) থেকে শুরু হয়ে এ উৎসব চলবে বৃহস্পতিবার (১৭ মার্চ) পর্যন্ত। বাউল সম্রাট লালন শাহ্ তার জীবদ্দশায় ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়িতে প্রতি বছর চৈত্রের দোল পূর্ণিমা রাতে বাউলদের নিয়ে সাধুসঙ্গ উৎসব করতেন ১২৯৭ বঙ্গাব্দের পহেলা কার্তিক তার মৃত্যুর পরও এ উৎসব চালিয়ে আসছেন তার অনুসারীরা। কিন্তু করোনার কারণে দুই বছর বন্ধ ছিল এ আয়োজন। এবার সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় লালন একাডেমি তিন দিনের এ লালন স্মরনোৎসবের আয়োজন করেছে।ইতোমধ্যে উৎসবকে ঘিরে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার কালী নদীর তীরে লালন আঁখড়াবাড়িতে চলছে উৎসব ও গ্রামীণ মেলার প্রস্তুতি। সেইসঙ্গে দুই বছর পরে সাধু ভক্তরা লালন মাজারে আসতে পারবেন বলে খুঁশি তারা। তিন দিনের আয়োজনে সাধুদের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে আয়োজকরা। উদ্বোধনী দিন থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিট থেকে লালন মুক্তমঞ্চে আলোচনা সভা এবং পরে বাউল গানের আয়োজন করা হয়েছে। ১৫ মার্চ প্রথম দিনের আলোচনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মো. ইসমাইল হোসেন, এনডিসি ।বুধবার (১৬ মার্চ) দ্বিতীয় দিনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালনের প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ।(১৭ মার্চ) শেষ দিনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মাহাবুব উল আলম হানিফ । তিন দিনের আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. সাইদুল ইসলাম সেই সঙ্গে উৎসব চলাকালীন সময়ে প্রতিদিন আলোচনা সভা শেষে দেশ বরেণ্য লালন গানের শিল্পী, লালন একাডেমির শিল্পীসহ গুণী সংগীত শিল্পীরা গান পরিবেশন করবেন বলে জানা গেছে। ডিসি সাইদুল ইসলাম জানান, ‘তিন দিনব্যাপী এ লালন স্মরণোৎসবকে ঘিরে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সেইসঙ্গে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি, র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যা ব), সাদা পোশাকে জেলা গোয়েন্দা (ডিসি) পুলিশ এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্বে থাকবেন।কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া গ্রামের এই আখড়াবাড়িই ছিল বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ্ এর প্রধান অবস্থান এবং এখানেই তিনি জীবনের শেষ প্রয়াণ নেন। তবে বর্তমান সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে লালন একাডেমি। এখানে লালন সমাধীস্থলকে স্মরণীয় করতে ১৯৬২ সালে একটি সমাধী সৌধ নির্মিত হয়েছে।ভক্ত, আশেকান, অনুসারী ও শিষ্যদের মতে, লালন তরুণ বয়সে রোগাক্রান্ত ও অচেতন অবস্থায় ছেঁউড়িয়া গ্রামের কালী গঙ্গার পূর্বপাশের তীরে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় মলম ফকিরের স্ত্রী মতিজান গ্রামের অন্যদের সাহায্যে সেখান থেকে উদ্ধার করেন। বাড়িতে এনে অসুস্থ লালনকে সেবা যত্ন করে সুস্থ করে তোলেন। এভাবে সান্নিধ্য লাভের মধ্য দিয়ে মতিজানের স্বামী মলম কবিরাজ নিজেও লালন সাঁইয়ের অনুসারী হয়ে উঠেন লালনের গুরু সিরাজ সাইয়ের কাছে দীক্ষা লাভ এবং লালনের কণ্ঠে পবিত্র কোরআন শরীফের শুদ্ধ পাঠ শুনে মলম কবিরাজ, স্ত্রী মতিজানসহ আশপাশের প্রতিবেশীরাও অনুরক্ত হয়ে উঠেন লালনের প্রতি। এই সময়ই লালন কোথাকার কে, কার সন্তান, কোথায় তার জন্ম, কী তার পরিচয় এ নিয়ে শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা। তবে এসব প্রশ্নের জবাবে লালন ছিলেন নিশ্চুপ। এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতেও লালন গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। পরে সিরাজ সাঁইয়ের কাছে দীক্ষা লাভের পর মলম কবিরাজ তার ভূসম্পত্তির একটা অংশ লালনকে লিখে দেন। একইসঙ্গে মলম কবিরাজের অনুরোধ ও গুরু সিরাজ সাঁইয়ের নির্দেশক্রমে লালন এই ছেঁউড়িয়া গ্রামে নির্মিত কুঁড়ে ঘরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন যা আজকের ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়ি নামে পরিচিতি পেয়েছে দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বময়।  লালনের জীবদ্দশায় এক বিধবা নারীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন আখড়াবাড়িতে যিনি পরে লালনের স্ত্রী রূপে এবং বিশাখা নামে পরিচিতি পান। লালন ফকির প্রতি বছর শীতকালে মহোৎসব করতেন, এবং সে উৎসবে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্ত আশেকান সাধু বাউল ফকিররা মিলিত হতো। ওই উৎসবকে ঘিরে সেখানে বাউল গানের আসর হতো এবং লালন ও তার স্ত্রী পরিচয়ধারী বিশাখাও সেই জলসায় অংশ নিতেন। সেখানে সব গানই মূলত লালন নিজেই রচনা ও সুর সংযোজন করতেন যা পরে তার শিষ্য-অনুসারীরা রপ্ত করতেন। লালনের জন্ম সংক্রান্ত তথ্যানুযায়ী সঠিক সময়কাল শনাক্তকরণ সম্ভব না হওয়ায় তিনি জীবদ্দশায় প্রকৃত অর্থে কত বছর বেঁচে ছিলেন তার নির্ণয় করা যায়নি। তবে তিনি যে একজন দীর্ঘায়ু ব্যক্তি হিসেবে বেঁচে ছিলেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই বলে শিষ্য-অনুসারীদের ধারণা।  তৎকালীন সময়ে শিলাইদহের জমিদার জ্যেতিরিন্দ্রনাথ ২৩ বৈশাখ ১২৯৬ বাংলা, ৫ মে ১৮৮৯ সালে পঞ্চবোটে রবীন্দ্রনাথসহ পরিবারের অন্যদের সামনে চেয়ারে বসিয়ে লালন ফকিরের একটি স্কেচ তৈরি করেন। স্কেচটি রবীন্দ্র ভারতী সোসাইটিতে রক্ষিত আছে এখনও। তার একটি ফটো কপি ও শিল্পী সহিদ হোসেন কর্তৃক উক্ত স্কেচের একটি নকল লালন একাডেমিতেও রক্ষিত আছে। আচার্য নন্দলাল বসু কর্তৃক লালন ফকিরের স্কেচটি শ্রী শচীন্দ্রনাথ অধিকারীর নির্দেশে কাল্পনিকভাবে অংকিত হয়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্কেচটি অংকনের এক বছর পর ১২৯৭ সালের ১ কার্তিক ইংরেজী ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন লালন ফকির।

Comments

comments

Close