আজ: ১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার, ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৫ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি, রাত ৮:২৪
সর্বশেষ সংবাদ
মতামত রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব: তুরস্ক কি বড় ক্ষতির দারপ্রান্তে?

রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব: তুরস্ক কি বড় ক্ষতির দারপ্রান্তে?


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ১৮/০১/২০২২ , ১১:৪১ অপরাহ্ণ | বিভাগ: মতামত


 প্রকৌশলী জাকারিয়া প্রামানিক:  ইউক্রেনীয় সীমান্তে রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি করার ফলে ইউক্রেনের পূর্বে সংঘাত ছড়িয়ে পরার বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে রাশিয়ার আক্রমণ বন্ধ করার  বিষয়ে কূটনৈতিক জগতে ঝড় চলছে। মস্কো এবং কিয়েভের মধ্যে সম্ভাব্য উত্তেজনা ন্যাটোর জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যারা কিনা দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়াকে কোনরকম উস্কানি না দিয়ে ইউক্রেনকে সহযোগিতার ব্যাপারে আশ্বস্ত করে আসছিল।

এই পরিস্থিতি তুরস্কের জন্য বিশেষ ভাবে চিন্তার। কারন, তুরস্ক এই অঞ্চলের একটি বৃহৎ শক্তি। সম্প্রতি তুরস্ক অনেক ন্যাটো মিত্রের সাথে সম্পর্ককে তিক্ত করে রেখেছে। এটি আংশিকভাবে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের মস্কোর প্রতি ঝুকে যাওয়ার  ফল। একইসঙ্গে এরদোগান ইউক্রেনের সাথে একটি গভীর রাজনৈতিক এবং সামরিক সম্পর্ক তৈরি করেছেন যেটিকে কিছু ন্যাটো মিত্র অত্যন্ত উস্কানিমূলক বলে মনে করে।

আপাতত, মনে হচ্ছে আঙ্কারা বাজী ধরেছে যে ইউক্রেন সীমান্তের সংকট কূটনৈতিকভাবে সমাধান করা যেতে পারে। তবুও রাশিয়ান কর্মকর্তারা কিইভের সাথে আঙ্কারার সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক এবং ক্রিমিয়ান তাতার সম্প্রদায়ের সাথে তুরস্কের সম্পৃক্ততাকে উস্কানিমূলক ভঙ্গি হিসাবে দেখেন। তুরস্কের অর্থনীতিতে অস্থিরতা, এরদোগানের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তা অবনমন এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ ককেশাস পর্যন্ত সংঘাত মঞ্চগুলোতে তুর্কি ও রাশিয়ান বাহিনীর মুখমুখি অবস্থানের কারনে তুরস্ক বর্তমান ন্যাটো সদস্যদের মধ্যে ইউক্রেন সীমান্ত সংঘর্ষে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুকিতে রয়েছে।

তুরস্কের এই ঝুঁকি হচ্ছে বলকান, মধ্যপ্রাচ্য এবং ককেশাসকে ঘিরে থাকা তাদের বৃহত্তর কৌশলগত শাসন এবং প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার ফলাফল। এই প্রচেষ্টা তুরস্ককে অনেক ন্যাটো মিত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে এবং রাশিয়ার সাথে একটি জটিল সমীকরণে আবদ্ধ করেছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে আঞ্চলিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তুরস্কের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। এ কারনে আঙ্কারা মস্কোর সাথে পারস্পরিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অনুসরণ করার সাথে সাথে তার কমিউনিস্ট পরবর্তী প্রতিবেশীদের সঙ্গে একটি অংশীদারী এবং পৃষ্ঠপোষকমুলক অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করেছিল। অতি সম্প্রতি, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিনীদের হস্তক্ষেপবাদের প্রতি সমর্থন হ্রাস এবং এশিয়ার প্রতি  ক্রমবর্ধমান মার্কিন মনোযোগের কারনে তুরস্কের এই বাঁক পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সুক্ষ ভারসাম্য বজায় রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে কারণ রাশিয়া এবং ন্যাটোর মধ্যে উত্তেজনা বেশ গভীর হয়েছে। আঙ্কারা রাশিয়ার ২০১৪ সালে ক্রিমিয়াকে সংযুক্ত করা এবং পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলে আক্রমণের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। মুসলিম, তুর্কি-ভাষী ক্রিমিয়ান তাতার সম্প্রদায় যারা রাশিয়ার দখলদার কর্তৃপক্ষের লক্ষ্যবস্তু, তাদের প্রতি তুরস্কে ব্যাপক সহানুভূতি আছে, যা কিনা একটি বৃহৎ ক্রিমিয়ান তাতার আবাসস্থলের আন্দলনে রুপ নিতে পারে। ক্রিমিয়া দখল করার সময় মস্কো ইউক্রেনের নৌবাহিনীর বেশিরভাগ জাহাজ এবং বন্দর অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নেয়, যা নাটকীয়ভাবে কৃষ্ণ সাগরে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করে এবং তুর্কি নৌবাহিনীর আগের বহু সুবিধা নস্যাৎ করে দেয়।

প্রতিক্রিয়া হিসাবে, তুরস্ক ক্রিমিয়ান তাতার গোষ্ঠীগুলিকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন প্রসারিত করে, এবং জোর দিয়ে বলে যে এটি রাশিয়ার সংযুক্তিকে স্বীকৃতি দেবে না। এটিই কিইভের সাথে তুরস্কের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়িয়েছে, বিশেষ করে ডনবাসে রাশিয়ান-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের মোতায়েন করা উন্নত সশস্ত্র টার্কিশ ড্রোন বিক্রির মাধ্যমে।

আঙ্কারার উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য ইউক্রেনই একমাত্র বা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পথ ছিল না বরং আরও অনেক উপায় ছিল। তুরস্ক সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেছিল, যা প্রাথমিকভাবে ছিল সিরিয়ার কুর্দিদেরকে সীমান্তে তাদের কর্তৃত্ব সুসংহত করতে বাধা দেওয়ার জন্য। ২০২০ সালে তুর্কি বাহিনী জাতিসংঘ-স্বীকৃত অন্তর্বর্তী সরকারকে শক্তিশালী করতে লিবিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছিল যার সাথে এটি ভূমধ্যসাগরে তেল এবং গ্যাসের খনিগুলোতে বিচরণের পথ সুরক্ষিত করার জন্য ডিসেম্বর ২০১৯ সালে একটি সমুদ্রসীমা চুক্তিও স্বাক্ষর করেছিল। এছাড়াও ২০২০ সালে তুর্কি অস্ত্রসমূহ নাগর্নো-কারাবাখ এবং এর আশেপাশে আর্মেনিয়ান-অধিকৃত অঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে আজারবাইজানের সফল আক্রমণে সহায়ক হিসাবে প্রমাণিত হয়েছিল। এই মঞ্চগুলির প্রতিটিতে, তুর্কি এবং রাশিয়ান বাহিনী মুখোমুখি হয়েছিল, কখনও কখনও সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল।

ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও, তুরস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলিতে রাশিয়ার সাথে একটি কৌশলগত সম্পর্ক অনুসরণ করেছে। এই সমঝোতার প্রধান চালক হল, প্রথমত, সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের প্রতি মার্কিন সমর্থন যাদের সবচেয়ে বড় উপাদান হল কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির একটি শাখার কুর্দি যোদ্ধারা এবং দ্বিতীয়ত হচ্ছে তুর্কি সেনাবাহিনীর ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার ফলাফল, যা যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ধর্মগুরু ফেতুল্লাহ গুলেনের অনুসারীদের মাধ্যমে সঙ্ঘটিত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তার করেছে। তুরস্কের বর্তমান মতাদর্শ বিশেষভাবে এরদগানের আদর্শ মুসলিমবিশ্বে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। ফ্রান্সের মুসলিম বিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান, ভারতে কাশ্মিরিদের প্রতি নির্যাতনের বিরুদ্ধে সু উচ্চ কণ্ঠ এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি মায়ান্মার সেনাবাহিনীর বরবরতম নির্যাতনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান তুরস্ককে মুসলিমবিশ্বের আশা ভরশার প্রতিকে পরিণত করেছে। তুরস্কের সামরিক শিল্পে অগ্রগতি ঈর্ষনীয়। বিশেষত ড্রন প্রযুক্তিতে তারা এখন আমেরিকার কাতারে যা কিনা রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতি ভয়ঙ্কর হুমকি। ভবিষ্যতের পরাশক্তি হওয়ার সমস্ত উপাদান তুরস্কে বিদ্যমান। এমতাবস্থায় তুরস্ক-ইউক্রেইন রাশিয়ার সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়লে তা শুধু তুরস্কের নয় বরং সমস্ত মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার অনেক দেশের জন্য বড় ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়াবে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিমবিশ্বে।

 

 

 

Comments

comments

Close