আজ: ৬ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার, ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২রা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি, রাত ৮:৩৮
সর্বশেষ সংবাদ
ফেসবুক থেকে একজন নকল সন্তানের আসল জবানবন্দি

একজন নকল সন্তানের আসল জবানবন্দি


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ১৫/১০/২০২১ , ৫:৩৫ অপরাহ্ণ | বিভাগ: ফেসবুক থেকে


বনানীতে অবস্থিত আউয়াল সেন্টারের আঠারো তলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে ঢাকা শহর দেখছি। রাত প্রায় গভীর। সালটা ঠিক মনে নেই। দুই হাজার নয় বা দশ। আমার লেখা গানের সিডি জমা দিয়ে এসেছি রেডিও টুডে’র তৎকালীন প্রযোজক জাহিদ বাবুল ভাইর হাতে। বুকে আশাবাদ করিতে করিতে চাষাবাদ, বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি আমি। পায়ের আওয়াজ শুনলাম কেউ উপরে উঠছে। পিছনে তাকিয়ে আনন্দে বুক ভরে গেলো। আরজে নীরব! আমার কৈশোরে টিফিনের টাকা জমিয়ে আড়াইশ’ টাকা দিয়ে কেনা সেই দুই ব্যাটারির ‘এফএম রেডিও’টা যাঁর অনুষ্ঠান শোনার উছিলায় আমার গলায় ঝুলতো- সেই আরজে নীরব! আমি সালাম দিলাম, তিনি দুই হাত বাড়িয়ে দিলেন। তারপর বুকে জড়িয়ে ধরে- দিলেন সালাম এর জবাব। আল্লাহ সাক্ষী- সেটাই ছিলো তাঁর সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ! প্রথম সাক্ষাতে পৃথিবীর কেউ আমাকে এতো আপন করে জড়িয়ে ধরে নাই।
সম্ভবত তিনি কোনো কাজে অফিসে উঠছিলেন। তাঁকে জানালাম- আমার লেখা গান নিয়ে একটা সিডি বেরিয়েছে যেটার নাম ‘অন্তর্দ্বন্দ্ব’। গানগুলো যদি রেডিওতে বাজানো হয়, আমি খুব কৃতজ্ঞ হবো। তিনি এক গাল হেসে বললেন- আগে শুনে দেখি, পছন্দ হইলে অবশ্যই বাজিয়ে দেবোনে। আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময়ে তিনি পিছন থেকে ডাকলেন, জিজ্ঞেস করলেন- এতো রাতে বাসায় ফিরবা, কিভাবে? পকেটে টাকা পয়সা আছে তো ফেরার? আমি উত্তরে বললাম- জি আছে। তিনি বললেন- না থাকলে নিয়া যাও? আরে বড়ভাই-ই তো আমি!
আমি টাকা নিলাম না ঠিকই, তবে নিলাম অন্য এক জিনিস। মুগ্ধতা। একটা মানুষ এতো বড় হওয়া সত্ত্বেও এতো ক্ষুদ্র ব্যাপারেও নজর আছে তার! তারকারাও যে এতো বিনয়ী হন, সেটার প্রথম মিছাল পেলাম তাকে দেখে। এরপরে আস্তে আস্তে বিনয়ের দীক্ষা পেয়েছি ক্রমান্বয়ে সৈয়দ আব্দুল হাদী স্যার, আইয়ুব বাচ্চু ভাই, মোশাররফ করিম ভাইয়া, সামিনা চৌধুরী আপা প্রমুখ উজ্জ্বল নক্ষত্র এর সান্নিধ্যে এসে। কলিজায় সরাসরি ঢুকে যাবার জন্য সবচেয়ে সুতীক্ষ্ণ ও পবিত্র অস্ত্র সম্ভবত বিনয়- যে বিনয়ের প্রথম পাঠ নিয়েছিলাম সেই ‘আরজে নীরব’ এর কাছ থেকে। এর মাঝখানে মেঘনায় কতো ভাটা এসেছে, যমুনায় কতো তরী ভেসেছে! সে খবর বিধাতা ছাড়া বোধকরি আর কেউ রাখেননি। ক্যালেন্ডারের পাতারা তখন অষ্টাদশী। অর্থাৎ, আঠারো সালে পা দিয়েছে বছর। আরজে নীরব এর প্রত্যক্ষ নির্দেশনার অধীনে কাজ শুরু করলাম একটি বেসরকারী এফএম রেডিওতে। কথা আর কাজের মিল কাকে বলে, শিখতে শুরু করলাম তাঁর কাছ থেকে। আমাকে ‘অমাইক’ থেকে ‘মাইক’ বানিয়ে ছাড়লেন অনেকটা জোর করেই। অর্থাৎ, মাইক্রোফোনে কথা বলাটা বাধ্যমূলক করে দিলেন সপ্তাহে পাঁচদিনের জন্য- ভাবা যায়?! যেই নাহিয়ানের ছিলো ‘পিএইচডি অন আইলসামি’, সেই নাহিয়ানের পিএইডি কেড়ে নিয়ে তিনি রাখলেন আমাকে দৌড়ের উপর! সকাল সকাল ঘুম ভাঙিয়ে বাসার নিচে এসে বাইকে চড়িয়ে আমাকে নিয়ে ঘুরতেন ঢাকা শহরের কর্পোরেট অফিস পাড়ায়। আর ঠেকে-অঠেকে আমার জীবনের দ্বিতীয় ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ হয়ে উঠলেন ভদ্রলোক। প্রথম জন আমার মাতৃতুল্য বড় বোন সোমা আপু। এই দুইজন কখনো টাকা ধার দিয়ে আর ফেরত চায় না। আল্লাহ যেনো এদের দুই জন কে আমার আয়ুর চাইতে পঞ্চাশ গুণ আয়ু দান করেন, এই দোয়া করি সব সময়।
কোনো এক অদ্ভূত কারণে এই ভদ্রলোক আমাকে “বাবা” ডাকা শুরু করলেন। টেনিস বলের বাউন্স সিস্টেমে আমিও শুরু করলাম তাকে “বাবা” ডাকা। এই জীবনে যতো জন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে যারা আরজে নীরব এর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে থেকেছে, তাদের কারো মুখ থেকেই শুনিনি “আরজে নীরব মানুষটা মোটামুটি ভালোই”, বরং প্রত্যেকের কাছ থেকে সবচাইতে বেশিবার শোনা বাক্যটি হচ্ছে “নীরব ভাই একটা অসাধারণ মানুষ”।
শেখানো-লেখানো-দেখানো-টেকানো এই বিষয়গুলোতে একজন আরজে নীরব- এর কাছাকাছিও কেউ নেই এই দেশের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে (আমার জন্য)।
ঊনিশ সালের কোনো এক শীত বিকেলে তাঁর কর্মক্ষেত্রে গিয়েছিলাম কোনো একটা কাজে। দেখলাম তার সামনে এক ছেলে বসা। যাওয়ার পরেই তিনি অভিযোগ করে আমাকে বললেন- কাউরে আর খুচরা খুচরা টাকা দিমু না রে। আমি জিজ্ঞেস করলাম- কেনো বাবা?
সামনে বসা সেই ছেলেটিকে দেখিয়ে তিনি বললেন- এই পোলা আজকে আমারে চৌদ্দ হাজার টাকা ফেরত দিয়া কয় নানান সময়ে অরে যে একশ’/দুইশ’ কইরা ধার দিতাম তার মোট অংক নাকি দাঁড়াইছে চৌদ্দ হাজার! উপস্থিত আমরা সবাই আট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম।
লিজা ভাবী (আরজে নীরবের স্ত্রী) তখন অন্তঃসত্ত্বা। ভাবীর সাথে রক্তের গ্রুপে মিল থাকায় আমাকে রক্ত দেওয়ার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিলো। একদিন দুপুরে বাবা ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন আজ সন্ধ্যায় ফ্রি আছি কিনা। আমি জানালাম হ্যা আছি। তিনি সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় নিমন্ত্রণ জানালেন এবং সঙ্গে আমার ডিএসএলআর ক্যামেরাটিকেও আমন্ত্রণ জানালেন। আমি আনন্দচিত্তে তাঁর বাসায় গেলাম। ভাবীর ‘বেবি শাওয়ার’ এর ছবি তুললাম সাগ্রহে। ফেরার সময়ে আমার পকেটে একটা খাম গুঁজে দেবার চেষ্টা করলেন তিনি। এইসবের কোনো মানে হয়? গুরু-শিষ্য এর মাঝখানে খাম আসিবে- ইহার কোনো মানেই নাই!
কিন্তু ব্যক্তিটি যে আরজে নীরব! তিনি স্পষ্ট স্বরে জানালেন- অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়েছে “ছেলে নাহিয়ান” কিন্তু ক্যামেরা দিয়ে কষ্ট করে ছবি তুলেছে “ফটোগ্রাফার নাহিয়ান”। তাঁর যুক্তির কাছে আমার তোরজোড় হেরে গেলো সেবারের মতো।
কয়েক সপ্তাহ পরে। সকাল সকাল ফোনে কল এলো আমার। ভাবীকে ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। চট করে চলে গেলাম ধানমন্ডি। রক্তের ক্রসম্যাচ সম্পন্ন করে ক্লিনিকের ওয়েটিং রুমের প্লাস্টিক চেয়ারে বসে আছি। সম্ভবত ভাবীকে ওটিতে নেওয়া হবে একটু পরেই। আমাকে স্ট্যান্ডবাই থাকতে বলা হয়েছে যাতে এক ডাকের সাথে সাথেই পাওয়া যায় আমাকে। তখন ‘বাবা’র মুখে রাজ্যের দুশ্চিন্তা। বিপরীতের আরেকটি চেয়ারে বসে আছেন আর বারবার নিজের চুলে আঙুল বুলাচ্ছেন। হঠাৎ মুখ থেকে দুশ্চিন্তার ছাপ সরিয়ে ফেলে আলতো একটা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- যাও নাহিয়ান খাবার খেয়ে আসো।
আমি অপারগতা জানালাম। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমাকে ধাক্কা মেরে খাবার খেতে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে উপস্থিত আমাকে ও অন্যান্য সবাইকে অবাক করলো তাঁর ‘লেভেল অফ কেয়ারিং’।
সারা বাংলাদেশে আমার মতো অন্তত কয়েক হাজার নাহিয়ান ছড়িয়ে আছে- যাদেরকে একজন আরজে নীরব শুধু দিয়েই গেছেন, বিনিময়ে কোনোদিনও কিচ্ছু নেননি।
জ্ঞান কিংবা অর্থ-
ছিলো না কোনো শর্ত।
দূর থেকে দেখে কিংবা শুনে আমরা অনেকেই অনেকের ব্যাপারে অনেক মন্তব্য করে থাকি। এটা আমাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। অথচ আমরা ভুলে যাই, একটা গোলাপের ঘ্রাণ নিতে হলে তার কাছে যাওয়া প্রয়োজন। দূর থেকে দেখতে প্লাস্টিকের গোলাপ আর সত্যিকারের গোলাপ প্রায় একই রকম। কিন্তু সত্যিকারের গোলাপের কাছাকাছি গেলে, সে তার ঘ্রাণ দিয়ে নিজের পরিচয়ের জানান দেয়। আমি কাউকে গোলাপফুল বলছি না। কিংবা কাউকে প্লাস্টিক বা আসল/নকলও বলছি না। আমি শুধু বলছি কাছ থেকে দেখা একজন অসাধারণ ব্যক্তির প্রতি আমার সাধারণ অভিব্যক্তি।
গত দশ অক্টোবর বিকেলবেলায় দেখা আমার বাবার সেই বন্দী ও বিষন্ন মুখটা আমি আর দেখতে চাই না। আমি শুধু জানি তিনি শুধু দিতে জানেন, নিতে জানেন না। অতএব যে দোষে অভিযুক্ত করে তাঁকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে, সেই দোষ আমি মানি না। জানি না আর কোনো কিচ্ছু। আমি শুধু আমার ‘বাবা’কে ফেরত চাই আমার বুকে। আমার মতো ‘নকল সন্তান’-এর বুকেই যদি থাকে বাবাকে ফেরত পাবার এতো তৃষ্ণা, তাহলে তাঁর শিশু সন্তান ”নীয়া”, যার বয়স মাত্র তিন বছর, তার বুকে না জানি বইছে কি হাহাকার!!
পৃথিবীর সকল বাবা
সর্বক্ষণ ভালো থাকুক,
বাবা তার সন্তানের গায়ে
নিজের গায়ের গন্ধ মাখুক।
লিখেছেন: আল নাহিয়ান , রেডিও জকি ।

Comments

comments

Close