আজ: ২৪শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার, ৯ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৪ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি, সকাল ৭:৪০
সর্বশেষ সংবাদ
মতামত শতবর্ষের পথে আলো আঁধারের রথে

শতবর্ষের পথে আলো আঁধারের রথে


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ অনলাইন | প্রকাশিত হয়েছে: ০২/০৭/২০২১ , ১:৫৬ অপরাহ্ণ | বিভাগ: মতামত


একদা ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষে পা রেখেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই অঞ্চলে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে রেখে প্রাগ্রসর মানবের জন্য বয়ে নিয়ে এসেছিল মহান সব কীর্তি, সৃষ্টির বিশাল ভান্ডার। সৃষ্টিশীল মানব তৈরির কাজটি করে আসছিল সুনিপুণভাবে প্রতিষ্ঠার পর হতে, বিংশ শতাব্দীতে। দেশের ইতিহাসের প্রতিটি পর্বে, প্রতিটি বাঁকে নিজের সাহসী ভূমিকার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিল। জাতিকে দেখিয়েছিল মুক্তি ও স্বাধীনতার পথনির্দেশিকা। সে সব আজ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। অর্জন তার বিশাল। গৌরব ও অহঙ্কার তার প্রতিটি পরতে পরতে। কিন্তু সেই গৌরব ক্রমশ ম্লান হয়ে এসেছে। নতুন করে প্রণোদনা জাগাতে পারছে না। বরং ক্রমেই স্তিমিত হয়ে আসছে তার গৌরবের ক্ষেত্রগুলো।
আলোর মশাল নিয়ে যাদের ছুটে যাবার কথা, তারা আজ অন্ধকার পথের যাত্রীদের সঙ্গে সমতালে ছুটছে। সমাজের অন্ধকার শ্রেণীর সঙ্গে হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধে রেখে আত্মহননে মত্ত যেন আজ। শতবর্ষে পা রাখার আগে এমন অগৌরবের পথে ঘুরপাক খাওয়া বড়ই করুণ, বেদনার এবং দুঃখেরও। আলো হাতে যারা গিয়েছে অগ্রসর মানব হয়ে, তারাও ব্যথিত হবেন, স্বাভাবিক। কিন্তু যারা দন্ডমুন্ডের কর্তা, তাদের কাছে এই মর্মঘাতী বেদনার কানাকড়ি মূল্য বুঝি নেই। তাই তারা আলোকে পেছনে ফেলে অন্ধকারের সঙ্গে হেঁটে চলছে। এই চলার শেষ বিনাশেই।

‘সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী’ এই মূলমন্ত্র নিয়ে একশ’ বছর আগে ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সত্যের জয় বারবার হয়েছিল বৈকি। সত্যানুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপেই সামনে এগিয়ে গিয়েছিল। যাবারই কথা তার। পূর্ববঙ্গের উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের জন্য যখন উন্মুক্ত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুয়ার, তখন অবিচার-অবহেলা-বঞ্চনা প্রত্যাখ্যান ও অন্ধকারের বিপরীতে জয় হয়েছিল আলোর। তাই গাত্রে তার লেখা হয়ে যায় ‘শিক্ষাই আলো।’ সেই আলো সে প্রজ্জ্বলিত করেছিল বাঙালীর অন্তরে-বাইরে। শুভকর্ম পথে ধরেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নির্ভয় গান। বিশ শতকে দেশসেরা নাগরিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল, সমগ্র বিশ্ব এবং এক অখন্ড জীবন পদ্ধতির একটি সুসামঞ্জস্য চিত্র পরিবেশন করা। এর মাধ্যমে লাভ করতে হয় একটি সামগ্রিক বোধ এবং জ্ঞানের বিভিন্ন দিকের পরিপূর্ণ অথচ সংক্ষিপ্ত একটি ভাবচিত্র। শুধু বিক্ষিপ্ত কতকগুলো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। একটি সুশৃঙ্খল বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবচিত্র লাভ করার সহজাত প্রেরণা মানুষের রয়েছে। বিচিত্র বিকাশের মধ্যেও জীবনের এক অখন্ড সত্তা অভিব্যক্ত তথ্যাবলির গভীরে প্রবেশ করে একটি অখন্ড জ্ঞান অর্জন করতে হয়। বিচ্ছিন্ন এবং বিক্ষিপ্ত সংগ্রহরূপে নয়। একে যেতে হয় একটি সুসমন্বিত সত্তারূপে। জ্ঞানের মূল ভিত্তিকে বাদ দিয়ে কখনও জ্ঞানী হওয়া যায় না। সহজলভ্য জ্ঞান দিয়ে কখনও প্রজ্ঞার ভান্ডার পূর্ণ হয় না। তথ্যভিত্তিক জ্ঞান আর বোধশক্তির মধ্যে দার্শনিক প্লেটো পার্থক্য নিরূপণ করেছিলেন তার সময়কালেই। এটা আজকের বাস্তবতা যে, উচ্চশিক্ষার অবস্থা মোটেই সন্তোষজনক নয়। ক্ষেত্রবিশেষে নেহাতই আশঙ্কাজনক। গড়পড়তা শিক্ষার মান দ্রুত পতনশীল। অনেকেই উপলব্ধি করতে পারছেন না। শিক্ষাক্ষেত্রে কি এক ভয়ঙ্কর অবস্থা বিরাজ করছে। মেধাবীরা হারিয়ে গিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিণতি শঙ্কা জাগায়। দশটি দশক পেরিয়ে নয়া দশকের শুরুতে এসে ঘুণপোকাদের ঘুণে ধরানো প্রক্রিয়ার প্রসার ঘটেছে এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন। একশ’ বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সাংগঠনিক পরিবর্তন এবং শিক্ষাগত ও বাহ্যিক পরিবর্তন ঘটেছে। পরিধি বাড়লেও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের প্রসার ঘটায়নি। ফলে জটিলতা, সমস্যা ইত্যাকার বিষয়ের প্রাদুর্ভাব ঘটে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনায় উঠে আসে কিভাবে এবং কেমন করে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে ক্রমে ক্রমে পরিণত ও ঋজু হয়েছিল। এ সময়ে বহু রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছে, সংঘর্ষ বেধেছে পুরনো চিন্তাধারার সঙ্গে নতুন চিন্তাধারার, ঔপনিবেশিকতার সঙ্গে জাতীয়তাবাদের, প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে প্রগতির। এই অঞ্চলে দু’বার শাসক বদল ঘটেছে। বহু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবশেষে লক্ষ্য হাসিল হয়েছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি ভাষা এবং পতাকা দিয়েছে এবং দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল অধিকাংশ ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী।
সব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ সব সময় গর্জে উঠেছে। সামরিক জান্তা শাসকের নিপীড়ন, নির্যাতন, অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টিসহ শিক্ষাবিরোধী ভূমিকার বিরুদ্ধে তার সন্তানদের গর্জে উঠতে প্রেরণা দিয়েছিল। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-গরিমা, জাতির সুযোগ্য সন্তান উপহার দানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে। কিন্তু একুশ শতকে এসে তার অবস্থা ও অবস্থান ক্রমশ আলোহীন অন্ধকারকে ধারণ করে চলছে যেন। শিক্ষা যদি সুস্থ ধারার হয় তাহলে অযাচিত আন্দোলন বা হস্তক্ষেপ হতে পারে না। শিক্ষার নামে যদি বিস্তার হয় কুশিক্ষার, তবে তাকে রোধ করবে কে? কুশিক্ষার কুফল মাঝে মধ্যে প্রকাশিত হয়। প্রথমাবধি যদি শিক্ষার ওপর জোর দেয়া যায়, তাহলে মিথ্যাচার ও বিকৃতি প্রশ্রয় পায় না। বিশেষত, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে। বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের জ্ঞানভান্ডারে প্রবেশের দ্বার এবং জাতীয় মণীষা বিকাশের শ্রেষ্ঠতম লালন ক্ষেত্র।
বাঙালীর জাতীয় জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক অনন্য ঐতিহ্যের অধিকারী। বিশ্বের জ্ঞানভান্ডার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী অধ্যাপকদের অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে। তেমনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দই জাতির নানা সঙ্কটে সঠিক ও বলিষ্ঠতম ভূমিকা পালন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপ্রাপ্ত তরুণরাই বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চেতনা বিকাশের নানা পর্যায়ে যুগে যুগে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত অর্ধশতাব্দীর সংগ্রামী ঐতিহ্য উজ্জ্বলতম হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্যাগ ও অবদান অবিস্মরণীয়।
এদেশের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কর্মচারীরা সংগ্রাম করেছেন। আত্মদান করেছেন। বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ইতিহাসে এ এক অভূতপূর্ব অতুলনীয় দৃষ্টান্ত। যদিও বাংলাদেশের সমাজ প্রগতির ধারায় এবং বাঙালীর জাতীয় জীবনে এর অবদানের সম্যক পর্যালোচনা অদ্যাবধি হয়নি। একাত্তরে প্রফেসর ও ডিনসহ ১৯ জন শিক্ষক এবং বহু ছাত্র ও কর্মচারী হানাদার পাকিস্তানী এবং তাদের দোসর রাজাকার; আলবদরদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু মূল্যবান সম্পত্তিও বিধ্বস্ত করা হয়। এক অপরিণামদর্শী ক্ষতির শিকার হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু উপাচার্যের বাসভবনে নারকীয় হামলা চালানো হয়নি। আর শতবর্ষে পৌঁছার আগে সত্যের জয়কে ভূলুণ্ঠিত করতে বিকৃত মিথ্যাচারকে উপস্থাপন করা হয়েছে ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে। ইতিহাসকে বিকৃত করে স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়। পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্রেরই অংশবিশেষ হিসেবে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়নকে বিকৃত করা হয়। বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থপতি ও বাঙালী জাতির পিতার ছিল সুদীর্ঘকালের সম্পর্ক। বিশ্ববিদ্যালয় নিশ্চয়ই দস্যুবৃত্তির শিক্ষাদান কেন্দ্র নয়, দৈত্য দানব তৈরির কারখানাও নয়। বর্বর মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণায় প্রসার ঘটানোও তার কাজ বা লক্ষ্য নয়। বরং এসবের বিপরীতে সত্যা সন্ধ জ্ঞানদান করাই তার মুখ্য কর্তব্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি দ্বিতীয় প্রজন্ম। আমার পিতা ১৯৩৭ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের ছাত্র হিসেবে আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিলেন। পরে ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পেয়েছিলেন। সদ্য প্রয়ত পঁচানব্বই বছর বয়সী আমার মায়ের কাছে সংরক্ষিত সার্টিফিকেট দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। ষাটের দশকের শেষে বাবার কাছে শুনেছিলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। শুনে গর্ব হতো। অক্সফোর্ড সম্পর্কে ভাসা ভাসা ধারণাও পেয়েছিলাম বাবার কাছ থেকেই।
শিক্ষা-দীক্ষা, গবেষণা, জ্ঞান-গরিমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালের পহেলা জুলাই প্রতিষ্ঠার পর থেকে একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিজেকে প্রতিভাত করতে পেরেছিল। ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ভর্তি হই, তখন দেশ জুড়ে সামরিক শাসন। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে সামরিক শাসক রাজনৈতিক দল অধ্যাদেশ ঘোষণা করে। এই সুযোগে স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোও সামরিক সরকারের স্বীকৃতি নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। তাদের অনুসারীরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুপ্রবেশের সুযোগ পায় তখন থেকেই। দালাল আইনে বিচারে শাস্তি পাওয়া ছাত্র, কর্মচারী ও শিক্ষকরাও ক্যাম্পাসে ফিরে আসতে থাকে। প্রশাসন থেকে শুরু করে শিক্ষকতায় পর্যন্ত ঠাঁই নেয়। ক্যাম্পাসকে নিয়ন্ত্রণে নিতে শাসকদের সহযোগিতায় সক্রিয় হয়ে ওঠে স্বাধীনতা বিরোধী পরাজিত শক্তি। অনেক শিক্ষক পাকিস্তানী হানাদারদের দালালি করেছে প্রকাশ্যে। জাতিসংঘে গিয়ে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারও চালিয়েছিল।
কেউ কেউ সহকর্মীদের হত্যার জন্য টিক্কাখান ও রাও ফরমান আলীর কাছে তালিকাও দিয়েছিল। একাত্তরের পহেলা জুলাই হানাদাররা ক্যাম্পাসে ক্লাস চালু করে। অনেক শিক্ষক ও ছাত্র যোগদান করে নিয়মিত ক্লাশ ও টিউটোরিয়াল পরীক্ষা নিয়েছে ও দিয়েছে। স্বাধীনতার পর দালাল আইনে অনেকের সাজা হলেও পঁচাত্তর পরবর্তী জান্তা শাসক তাদের শাস্তি মওকুফ করে জেল থেকে মুক্তি দেয়। এদের অনেকে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় চাকরি ফেরত পায় শাসকদের সহায়তায়। ছিয়াত্তর সাল হতে দলে দলে পাকিস্তানী দালাল শিক্ষক, কর্মচারী ও ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান শুরু করে। ক্লাসে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য প্রদানে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত বা অপরাধ বোধ করতো না তারা।
এদের ছত্রছায়ায় ’৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলবদরে পরিণত হওয়া ইসলামী ছাত্র সংঘের ক্যাডাররা সংঘবদ্ধ হয়ে নয়া নাম ইসলামী ছাত্র শিবির গড়ে তোলে। তারা প্রথমেই স্বাধীনতার স্মারক অপরাজেয় বাংলা ভাঙার জন্য গাঁইতি শাবল নিয়ে হামলা চালিয়েছিল। ছাত্রদের প্রতিরোধের মুখে অবশ্য পালিয়েছিল। কিন্তু গোপনে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে থাকে। ১৯৭৯ সালে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে বিনা বাধা ও প্রতিরোধে শিবির অংশ নেয়ার সুযোগ পায়। দু’একজন ছাত্রনেতা বিরোধিতা করলেও ধোপে টেকেনি। শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িতরা দেশ ও মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতা চালাতে থাকে। ক্রমেই তাদের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে। আর এখন তো শিবির থেকে শিক্ষক, কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সংখ্যা কম নয়।
‘মুখে জয় বাংলা, অন্তরে পাকিস্তান’, ধারণ করে শিবিরের লোকজন সর্বত্র অবস্থান ও ভিত্তি মজবুত করছে। শাসকদলে এমনকি সরকারেও তাদের দাপট বিস্তৃত হয়েছে। ধর্মান্ধতাও ছড়িয়ে দিচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগেও। এই ক্যাম্পাসেই হিজবুত তাহরীর নামক জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদী সংগঠন গড়ে ওঠেছে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে। ছাত্রদের যা শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, তা স্বাধীনতার ইতিহাসকে ম্লান করে দিচ্ছে। এই হচ্ছে অবস্থা। তাই মুক্তচিন্তা, প্রগতিশীল সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা স্তিমিত হয়ে আসছে ক্যাম্পাসে। জামায়াত-শিবিরের চেতনাধারীদের সংখ্যা বাড়ছে। তাই দেখা যায় কোটা সংস্কার ও বাতিল নামক আন্দোলনে সংগঠিত ও নেতৃত্বদানে ছাত্র শিবির ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থার প্রাধান্য। তাদের সঙ্গে একদা প্রগতিশীল খ্যাত বাম মার্গীয়রাও সংযুক্ত হয়েছিল।
যে বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয় আজ কোন পথে? এমন প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। এই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কোটা আন্দোলনকালে এক রাজাকার সন্তান, বুকে ‘আমি রাজাকার’ লিখে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ব্যাঙ্গাত্মক আচরণ দিয়ে প্রমাণ করেছে, একাত্তরের নরঘাতকদের উত্তরসূরিরা পূর্ব-পুরুষের শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাদের ক্ষোভ ও উষ্মার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে যেমন এভাবে, তেমনি উপাচার্যের বাসভবনে তান্ডব চালিয়ে। মুক্তিযোদ্ধার কোটাই ওদের আঁতে ঘা দিয়েছে। তাই একে ইস্যু বানিয়ে মুহূর্তেই রাজাকার বনে যেতে দু’বার ভাবেনি। বিষয়টি মেধার নয়; বরং চেতনার। হুজুগে, গুজবে প্রজন্মের শিবিরীয় চেতনাধারীদের এমন ধৃষ্টতা অনেকের কাছেই তথা বাম মার্গীয়দের কাছেই সহমর্মিতার আকর হয়ে উঠেছিল। বুকে রাজাকার অঙ্কনকে গৌরব হিসেবে তুলে ধরার মতো স্পর্ধা যখন ক্যাম্পাসে প্রদর্শিত হয়, তখন মুক্তিযুদ্ধের ধারক সংগঠন লেজ গুটিয়ে থাকে আর আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বৃথা হতে থাকে। ‘আমি রাজাকার’ নামধারীরা দেশের ও জাতির শত্রু। এদের নির্মূল করা মুক্তিকামী জাতির জন্য অবশ্যই কর্তব্য।
গৌরব ম্লান হয়ে আসছে ক্রমশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে পৌঁছানোর পূর্ব হতেই। বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোকিত এই প্রতিষ্ঠানটিতে একালে যুক্তিবিবর্জিত নানা আচরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। উপাচার্যের বাসভবনে অকারণে তান্ডব চালানো, চারুকলায় ভাংচুরসহ অন্যান্য অপরাধ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেকেই থেকেছেন নিরব, এমনকি সিনেট সদস্যরাও। বরং দেখা গেছে, এসব বিষয় আড়াল করার জন্য বাম মার্গীয় শিক্ষক ও ছাত্ররা কবি সুফিয়া কামাল হলে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে সংঘটিত ঘটনাগুলো নিয়ে সোচ্চার শুধু নয়, আন্দোলনও করেছেন। শিবির ও হিজবুত তাহরীর সম্পর্কে বিষোদগার তাদের মুখে শোনা যায় না; বরং মনে হয় এদের বৈধতা দেয়ার জন্যই নারকীয় ঘটনাগুলোকে আড়াল করার এই প্রবণতা, যা প্রতিক্রিয়াশীলতারই নামান্তর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস জুড়ে বর্জ্য ও আবর্জনার যে স্তূপ গড়ে উঠছে, স্বাধীনতা বিরোধী ও বাম মার্গীয়দের যৌথ অপচেষ্টায়, তা বেশিদূর যেতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে সাময়িকভাবে অনেক ক্ষতি করতে পারে। তাই একালে এমন একজন শিক্ষক খুঁজে পাওয়া যায় না, যার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা জাগে। অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের উপর যৌন নিপীড়ন ঘটানোর ঘটনা প্রায়শই সংবাদপত্রে যখন ছাপা হয়, তখন নিজেকেই ধিক্কার দিতে হয় যে, আমি এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলাম। একালের শিক্ষকরা ভাবীকালে স্মরিত হবেন ঘৃণার আদলে স্বাধীনতা বিরোধীদের নেতৃত্বে নিয়ে আনার জন্য, ছাত্রী নিপীড়ন ও অন্যান্য অপরাধের কারণে।
সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী মূলমন্ত্র নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বুঝি মিথ্যার জয় অবশ্যম্ভাবী প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। তাই ক্যাম্পাস জুড়ে তান্ডবের ঘটনা আড়াল হয়ে যায়। আর শিবিরের নেতৃত্বে আন্দোলন নামক অরাজকতায় বাম মার্গীয়রাও অংশ নেয়, মানববন্ধন করে। শতবর্ষের কালে একদা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড, ধস নামতে নামতে এখন খাদের কিনারে। শতবর্ষের এই সময়ে কে তাকে জাগাবে, কে দেবে ভরসা, বলবে ‘শিক্ষাই আলো’ সে আলো ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে। না, কেউ নেই বুঝি কোথাও। করোনাকালে অনেক কিছুই স্তিমিত হয়ে আছে যদিয়ো।
লেখক : কবি, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও মহাপরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)।

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: