আজ: ২৫শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার, ১০ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৫ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি, দুপুর ১২:৪৭
সর্বশেষ সংবাদ
মতামত ‘ইসলাম হেফাজতের নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে মূল ধারার কার্যক্রমে নেই হেফাজতে ইসলাম’

‘ইসলাম হেফাজতের নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে মূল ধারার কার্যক্রমে নেই হেফাজতে ইসলাম’


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ অনলাইন | প্রকাশিত হয়েছে: ২৬/০৪/২০২১ , ২:৩৬ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: মতামত


মোয়াজ্জেম হোসেন:  ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে অতিথি হয়ে আসাকে ‘ অছিলা’ বানিয়ে মূলত হেফাজতে ইসলাম তাদের পেশীশক্তির জোর দেখাতে চেয়েছিল। তবে তারা নিজেদের সামর্থ্য ও শক্তির বিচার সেভাবে করতে পারেনি। তারা বুঝতে পারেনি যে, আল্লামা শাহ আহমদ শফীর হেফাজতে ইসলাম আর জুনায়েদ বাবুনগীর হেফাজতে ইসলাম কিন্তু একই সক্ষমতার ইসলামিক সংগঠন নয়। সক্ষমতা বলতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, একটি রাষ্ট্রে বসবাস করে সে রাষ্ট্রের নীতিকে অনুধাবন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকেই বুঝানো হচ্ছে।

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্র-স্বীকৃত সনদ দিয়ে তাদের ‘ভালো রাখার’ দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। যদিও তারা এর যোগ্য কখনই নয়। কারণ তাদের চিন্তায়, বিবেকে মেধার চেয়ে হুজুর তোষামোদিই প্রাধান্য পায়। তাদের হুজুরেরা এলমে দ্বীনের চর্চা বিসর্জন দিয়ে নেমেছে হেফাজতে ইসলামের নামে এখন রাজনৈতিক ফায়দা এবং ক্ষমতাবৃন্তের স্বাদ আস্বাদনে। যাদের পেছনে হাঁটছে কওমি মাদ্রাসার কোমলপ্রাণ শিক্ষার্থীরা। ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের উত্তরসূরির তকমা মুছে তারা এই দেশে ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক দলগুলোর এজেন্ডামুখী হওয়ার মধ্যেই আত্মতৃপ্তি খুঁজতে নেমেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

ইসলামপন্থী এই মেধাবী মুখগুলো পবিত্র কোরআনের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্বের বিপরীতে সময়ে সময়ে নামছে সহিংসতার আমেজ নিয়ে। যাদের কণ্ঠে সুললিত ধ্বনিতে শুনতে পাওয়ার কথা পবিত্র কোরআনের আয়াত, সহিহ হাদিসের ব্যাখ্যা, তাদের কণ্ঠে শুনতে পাওয়া যায় চতুর কিছু রাজনৈতিক এতিমদের শিখানো বেফাঁস বুলি! তাদের দেখা যায় অশ্লীল ভাষায় কখনও জুতা, কখনো লাঠি হাতে মিছিল করতে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে আসা বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদিকে অসম্মানিত করতে রাস্তায় নামা হেফাজতে ইসলাম আজ ‘বোকাদের’ সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি নিয়েছে। দ্বীন ইসলামের আকিদা অনুসরণের নামে, ইসলামের হেফাজত করার নাম নিয়ে যে সংগঠন আল্লামা শাহ আহমদ শফি সুদৃঢ় করেছেন সে সংগঠন তার লক্ষ্যচ্যুত হয়েছে। কারণ ইসলাম কখনোই তার শত্রুর বিরুদ্ধেও এভাবে কদর্যপূর্ণ বক্তব্য কিংবা আচরণ সমর্থন করে না। নরেন্দ্র মোদিকে যদি তারা ইসলামের শত্রুও মনে করে তবুও তার বিরুদ্ধে এমন ঘৃণ্য ও সহিংস আচরণ প্রদর্শন ইসলামের আকিদা পরিপন্থী।

ইসলাম গ্রহণকারীদের জন্যই শুধু নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য পবিত্র কোরআনকে আল্লাহ গাইডলাইন হিসেবে পাঠিয়েছেন। সেই কোরআনের সূরা হুজরাতের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ইমানদারগণ! এক কওম (জাতি) যেন অন্য কওমকে বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। আর নারীরাও যেন অন্য নারীদের বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অপরকে বিদ্রূপ করো না এবং পরস্পরকে খারাপ নামে ডেকো না।
সূরা ফোরকানের ৬৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহর আসল বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীর বুকে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং মূর্খরা তাদের সঙ্গে কথা বলতে থাকলে বলে দেয়; তোমাদের সালাম’।

সূরা ফুসসিলাতের ৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘সৎ কাজ ও অসৎ কাজ সমান নয়। তুমি অসৎ কাজকে সেই নেকি (ভালো কাজ) দ্বারা নিবৃত্ত করো যা সবচেয়ে ভালো। তাহলে দেখবে যার সঙ্গে তোমার শত্রুতা ছিল সে অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে।
অথচ এই কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের দিচ্ছে সম্ভবত আল্লাহর কোরআনের এসব আয়াতের উল্টো শিক্ষা। আমরা নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে এই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মুখে শুনতে পেলাম অসম্মানের বুলি। যা আমাদের ব্যথিত করেছে।

আজকে যদি ধরেই নিই, নরেন্দ্র মোদি তার দেশে ইসলামবিরোধী হিসেবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন, তবুও ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের উত্তরসূরি খ্যাত কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কিভাবে কোরআনের আয়াতের বিপরীতে গিয়ে ‘শত্রু’র বিরুদ্ধে নোংরা পন্থায় নোংরা আচরণ প্রদর্শন করবে? নরেন্দ্র মোদির কর্মকাণ্ডের কথিত সমালোচনা করতে গিয়ে দুই রাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট করা কি ইসলামের রাষ্ট্রীয় নীতি হতে পারে? রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সিদ্ধান্তগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন কি ইসলাম সম্মত?
মানবাধিকার ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সর্বোচ্চ নিদর্শন স্থাপন করেছেন আল্লাহ’র রসুল হযরত মুহাম্মদ (স.)। তার নীতিতে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অটুট রাখার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

মুহাম্মদ রসুল (স.) বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদেরও ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে অসম্মানজনক কোনো আচরণ তিনি দেখাননি। ইসলাম প্রচারের শুরুতে তিনি বিভিন্ন গোত্র ও দেশের রাজা বা সম্রাটের কাছে দূতের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের জন্য অথবা রাজনৈতিক কারণে দূত পাঠিয়েছিলেন। সে সময় বাইজেন্টাইন, মিসর, পারস্য ও ইথিওপিয়ার সম্রাটরা এই দূতদের সম্মান দিয়েই গ্রহণ করেছেন। এই দূতরা যে বার্তা নিয়ে যেতেন তা তারা শুনতেন।

রোমের বাদশা হেরাক্লিয়াসকে হযরত মুহাম্মদের (স.) পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ ছিল, ‘বরাবর হেরাক্লিয়াস, গ্র্যান্ড চিফ অব রোম (বাইজেন্টাইন); আল্লাহর প্রেরিত ধর্মপ্রচারক মুহাম্মদের (স.) পক্ষ থেকে যারা সত্যকে অনুসরণ করে তাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। মহান আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। আপনি মুসলিম হন। নিরাপদে থাকুন। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কৃত করবেন। আমাদের মধ্যে আপনি এবং ধর্মগ্রন্থে বিশ্বাসীরা আল্লাহর একই কথা শুনতে পাবেন। আসুন, আমরা একই আল্লাহর ইবাদত করি। অন্য কাউকে নয়; অথবা অন্য কাউকে তার সাথে শরিক না করি। যদি আপনি বিশ্বাস করেন, তাহলে বলুন- আমরা মুসলিম এবং যদি তা না হয়, তাহলে জনগণের পাপের ভাগীদার আপনি হবেন’। কিছু ইতিহাসবিদদের মতে, ইথিওপিয়ার সম্রাট ও মিসরের মুকাওকাস হজরত মুহাম্মদের (স.) আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন।

ইসলাম বন্ধু রাষ্ট্রের প্রতিনিধির সঙ্গে আচরণ কী হবে সে বিষয়ে ধারণা দিয়েছে বহু শতাব্দী আগে।

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: