আজ: ৮ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার, ২৫শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৬শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি, সকাল ১০:২৫
সর্বশেষ সংবাদ
জেলা সংবাদ, প্রধান সংবাদ, রংপুর বিভাগ ১৬ বছর ধরে শিকলবন্দী রংপুরের পীরগঞ্জের গোলাম মওলা : সরকারী সুযোগ-সুবিধাও জোটেনি ভাগ্যে

১৬ বছর ধরে শিকলবন্দী রংপুরের পীরগঞ্জের গোলাম মওলা : সরকারী সুযোগ-সুবিধাও জোটেনি ভাগ্যে


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ অনলাইন | প্রকাশিত হয়েছে: ২৬/০৪/২০২১ , ২:০০ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: জেলা সংবাদ,প্রধান সংবাদ,রংপুর বিভাগ


আল কাদরি কিবরিয়া সবুজ:
অর্থাভাবে চিকিৎসা নেই, পেট পুরে খাবার নেই, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা দুরের কথা- থাকার স্থান বলতে ভাঙ্গা টিনের  একটি ছাপড়া।  তিন পাশ পরিত্যাক্ত ছেঁড়া কাপড় ও প্লাষ্টিকের বস্তা দিয়ে ঘেরা ৬/৭ ফুট ব্যাসার্ধের একটি ঘর নির্জন কবরস্থানে। ঘরের মাঝে সবুজ রংয়ের মশারী সাটানো। তার মধ্যে অপরিচ্ছন্ন ১টি কম্বল আর ১টি নেকড়ায় পেঁচানো বালিশ। ঘরটির দেড়-দুই ফুট দুরে মল-মুত্র ত্যাগ, গোসল ও খাওয়া-দাওয়া। থাকার ঘর ও আশপাশের গা ঘিনঘিন করা আবর্জনায় মানুষ তো দূরের  কথা পশু-পাখিরও থাকার অযোগ্য। সেই নির্জন কবরস্থানেই শীত-মৌসুম, রোদ-বৃষ্টি এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে টানা ১৬ বছর ধরে শিকলবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন ৪৯ বছর বয়সের মানসিক প্রতিবন্ধী রাষ্ট্রীয় মৌলিক অধিকার বঞ্চিত গোলাম মওলা।  গ্রামে মওলা পাগলা হিসেবেই পরিচিত। পায়ে মোটা লোহার শিকল দিয়ে কাঁঠাল গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে। এর আগে মওলাকে প্রায় ১৫ বছর ধরে পায়ে শিকল বেঁধে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে রাখা হয়েছিল। সে রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার ভেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের শরীফপুর গ্রামের মৃত মোজাব উদ্দিনের পুত্র।

এ দীর্ঘ সময়েও অসহায় মওলা’র খোঁজ-খবর নেয়নি কেউ, চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়নি কোন হাসপাতালে। তার ভাগ্যে জোটেনি সরকারী ঘর কিংবা প্রতিবন্ধী ভাতা। সরকারি সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত মানসিক প্রতিবন্ধী মওলা এখন অযত্ন-অবহেলা ও অবজ্ঞায় দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মওলা’র বাবা-মা অনেক আগেই মারা গেছেন। তারা ৫ ভাই, মওলা সবার ছোট। তার ভাইয়েরা হলেন- গোলাপ মিয়া, সোনা মিয়া, আলম মিয়া ও মনুহার মিয়া। তারা জানায়, মওলা’র বয়স যখন ১৭ বছর তখন কাজের সন্ধানে পাড়ি জমায় ঢাকায়। সেখানে এক টোকাইয়ের  ঢিলে মাথায় প্রচন্ড আঘাত পায় মওলা। সেই থেকেই মূলত মানসিক রোগী। তাকে চিকিৎসা দিতে তার সর্বশেষ পৈতৃক সম্পত্তিটুকুও বিক্রি করতে হয়।  টকবগে  যুবক মওলা বেশ কিছুদিন ভালই ছিল, তখন তার বয়স ১৮/১৯। পারিবারিকভাবে তাকে বিয়েও দেয়া হয়। কিন্তু তার মানসিক ভারসাম্যহীতার কারণে বেশিদিন টেকেনি সংসার।

২৪ এপ্রিল শনিবার বিকালে সরেজমিনে গিয়ে মওলা’র সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে সে কোন জবাব না দিয়ে শুধু প্রতিবেদকের দিকে  তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ ব্রেঞ্চ থেকে পায়ের শিকল হাতে নিয়ে হাউমাউ করে কান্না। তারপর অশ্রুসিক্ত চোখে  নিজেকে আড়াল করলো তথাকথিত ঘরের মধ্যে।

বড়ভাই গোলাপ মিয়ার সঙ্গে কথা হলে বলেন, আমরা সবাই অসহায় পরিবার, দিন আনি দিন খাই। তবুও ছোট ভাইকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে পেতে সাধ্যমত চেষ্টার ত্রুটি হয়নি। ওর (মওলা) চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমরা এখন পথের ভিখারী। সরকারী বা বেসরকারী কোন সাহায্য সহযোগীতা না পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সেজোভাই আলম মিয়া জানান, বর্তমান করোনাকালীন সময়ে নিজে খেয়ে-পরে বাঁচায় মুশকিল- ওকে বাঁচাবো কেমনে? মেজোভাই সোনা মিয়া জানান, ওকে (মওলা) ছেড়ে দিলে গ্রামের বিভিন্ন লোকজনকে মারডাংসহ ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাড়া করতো। এছাড়া প্রতিবেশীদের কিছু হারিয়ে গেলে তাকেই দোষারোপ করতো এবং প্রায়ই নালিশ দিতো। তাই বাধ্য হয়েই তাকে শিকলবন্দী করে রাখা হয়েছে। আমরা নিজেরাই অসচ্ছল, তবুও সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি তাকে বাঁচিয়ে  রাখার। আমাদের সেই সামর্থও নেই যে, তাকে সু-চিকিৎসা দেবো।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিরোধা রাণী রায়ের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, বিষয়টি আপনার মাধ্যমেই অবগত হলাম। তাকে জরুরী ভিত্তিতে (গোলাম মওলা) সরকারী সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে।

এ বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম প্রধান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাকে সহযোগীতা করা হবে। তবে তার চিকিৎসার জন্য সরকারী বা সমাজের বিত্তবানদের সহযোগীতা কামনা করেছেন।

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: