আজ: ১৫ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার, ২রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৩রা রমজান, ১৪৪২ হিজরি, সকাল ৮:৩৯
সর্বশেষ সংবাদ
মতামত পরিস্থিতি কেন পুনরায় বৈরী হলো?

পরিস্থিতি কেন পুনরায় বৈরী হলো?


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ০৬/০৪/২০২১ , ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: মতামত


আমরা করোনা সংক্রমণে ফের মুখোমুখি হলাম চরম বৈরী পরিস্থিতির। দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ঠেকাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের প্রস্তুতি ও এক্ষেত্রে নানারকম অসংগতির কথা ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে আমরা নতুন করে চরম উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে নিপতিত হলাম, এর জন্য কি সিংহভাগ মানুষের অসচেতনতা-অসতর্কতাই মুখ্যত দায়ী নয়? একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না, আইন করে মানুষকে আর কতটাই-বা সচেতন করা সম্ভব, যদি ব্যক্তি নিজে নিজেকে সুরক্ষার ব্যাপারে সচেতন-সতর্ক না হন।
আমরা যারা করোনা সংক্রমণ কিংবা এর বিভিন্ন ধরন নিয়ে গবেষণা করছি, প্রায় দিনই সংবাদমাধ্যমে কথা বলছি, কিংবা লেখালেখি করছি—তারা বরাবরই খুব জোর দিয়ে যে কথাটি বলে আসছি তা হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে কোনোরকম শৈথিল্য দেখানো হবে আত্মঘাতীর শামিল। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও এই সত্য অস্বীকার করা যাবে না—আমাদের সমাজের বৃহদংশের মধ্যেই বরাবরই স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের ক্ষেত্রে মারাত্মক শৈথিল্য লক্ষ করা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোটেও কাঙ্ক্ষিত ছিল না। যাদের নিয়মনীতি মেনে চলার ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটেছে কিংবা গাইডলাইনের উদাসীনতার কারণে আজ পুনর্বার যে ভয়াবহতার সৃষ্টি হলো তা সবার জন্যই অমঙ্গল আনল। ব্যক্তি বা অনেকের ভুলের দায় বহন করতে হচ্ছে আজ সমগ্র জনগোষ্ঠীকে।

‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম’—জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এই নীতি শুধু আমাদের সমাজেই নয়, বিশ্বের আরো অনেক সমাজেই অনুসরণ করা হয়। যে কোনো সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায় হলো যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি বা নিয়ম মেনে চলা। করোনার মতো নতুন ধরনের প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের ক্ষেত্রে তা আরো জরুরি। গত বছরের মার্চে যখন দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় তখন থেকেই করোনা প্রতিরোধে অর্থাত্ সংক্রমণ থেকে রেহাই পেতে করণীয় কী তা যেমন সরকারি তরফে বারবার প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়েছে, তেমনি সংবাদমাধ্যমও এ ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এখন পর্যন্ত তা শুধু অব্যাহতই নয় বরং এই কার্যক্রম আরো জোরদার হয়েছে। ফলে দেশের একেবারে প্রত্যন্ত এলাকার একজন মানুষও আমার মনে হয় এ বিষয়ে যথেষ্টই জানেন।
রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত শেষের কবিতা নাটকে ‘মেনে নেওয়া’ ও ‘মনে নেওয়া—এ দুই যুগল শব্দ নিয়ে একটি বিখ্যাত বাক্য-সংলাপ আমরা শুনতে পাই। তাই ‘মেনে নেওয়া’ আর ‘মনে নেওয়া’র মধ্যে বিস্তর তফাতটাও সেখানে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমাদের সমাজে অনেকেই সরকারি কিংবা জনস্বাস্থ্যবিদদের করোনা প্রতিহতকরণে সতর্কবার্তা অথবা করণীয় সম্পর্কে অনেক কিছু সংবাদ ও অন্যান্য মাধ্যমে অহরহ শুনছেন বটে কিন্তু মান্য করছেন না। অর্থাত্ অনেকেই এসব শুনেছেন-শুনছেন এবং সত্য বলে মেনেও নিয়েছেন কিন্তু মনে নেননি। যদি মনে নিতেন তাহলে তা মান্য করে চলতেন এবং আমরা পুনর্বার বিপর্যয়ের কিংবা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়তাম না। যারা জেনেও মানছেন না এবং এই অমান্যতার কারণে সৃষ্ট আজকের বিপজ্জনক এই পরিস্থিতির দায়টা তারা এড়াতে পারেন না। যারা নিজের ক্ষতির পাশাপাশি অন্যেরও ক্ষতি করলেন এবং আজ বলতে গেলে গোটা দেশ আবারও একটা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নিমজ্জিত হলো তা স্রেফ ভুলের জন্য এবং এ কারণে কঠিন মূল্য দিতে হচ্ছে।
সরকারের ১৮ দফা নির্দেশিকার সমন্বিত ও যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সমস্যা আরো প্রকট হয়ে উঠেছে। আমরা বারবার বলেছি মাস্ক সামাজিক ভ্যাকসিন। এর ব্যবহারের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া—এসবই হলো করোনা ভাইরাস সংক্রমণের অন্যতম মুখ্য প্রতিরোধ পন্থা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখনো এসব কিছুরই অনেক ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটতে দেখা যাচ্ছে। সংক্রমণ ৫ শতাংশ বা এর নিচে থাকলে আমরা তা সহনীয় বলি। কিন্তু এখন এই হার কয়েক গুণ বেশি। আমরা জানি, গ্রীষ্মকালে করোনা ছাড়াও সব ধরনের সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপই বাড়ে। করোনার ক্ষেত্রেও গতবার ও এবার তা-ই দেখা গেছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের উচ্চমাত্রার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার যে নির্দেশনা জারি করেছে, তা মান্য না করলে এর ফল হবে ভয়াবহ। সংক্রমণের হার যেমন আগের দিনের রেকর্ড পরের দিন ভাঙছে তেমনি মৃত্যু হারও বাড়ছে। ভ্যাকসিন গ্রহণকারী অনেকেই মনে করেছিলেন আমরা বিপদমুক্ত হয়ে গেছি। কিন্তু আমরা এ-ও বারবারই বলেছি, ভ্যাকসিন নিলেও স্বাস্থ্যবিধির ব্যত্যয় ঘটানো চলবে না।
ভ্যাকসিন নেওয়ার পর ন্যূনতম ১৪ দিন সময় প্রয়োজন শরীরে প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে উঠতে। কারো কারো এর বেশি সময়ও লাগতে পারে, আবার কারো কারো ক্ষেত্রে তা কার্যকরও নাও হতে পারে। তাই সর্বাবস্থায় জরুরি স্বাস্থ্যবিধির অনুসরণ সংক্রমণ আমাদের ঠেকাতেই হবে। তা না হলে আমরা বহুমুখী সংকটে পড়ব। আমাদের এখানে আইসিইউ নিয়ে কথা হচ্ছে রাতারাতি আইসিইউ বাড়ানো যাবে না, তাছাড়া বিষয়টি অত্যন্ত ব্যয়বহুলও। আমি মনে করি, এখন আইসিইউর চেয়েও জরুরি হাই ফ্লো অক্সিজেন। একই সঙ্গে জরুরি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা। এগুলো নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুহার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। গত এক বছরেরও বেশি সময়ে করোনা সংকটজনিত আমাদের অভিজ্ঞতা যেমন হয়েছে তেমনি ব্যবস্থাপনাও উন্নত করা হয়েছে। চিকিত্সাবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে সবার কাছে নিবেদন—নিয়মনীতি মানুন, নিজে বাঁচুন অন্যকে বাঁচান। ভ্যাকসিন সংগ্রহ ও প্রয়োজনমতো প্রাপ্তির ব্যাপারে আমরা খানিকটা সংকটে আছি। এ ব্যাপারে করণীয় সবকিছু দ্রুত করতে হবে।
ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সব ভ্যাকসিন হয়তো আমরা পাব। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরে তা আরো স্পষ্ট হয়েছে। তবে প্রক্রিয়াটি একটু বিলম্বিত হয় কি না—এ নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে। সিরামের ওপর অনেক দেশের নির্ভরশীলতা রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের নিজেদের চাহিদার বিষয়টিও জরুরি। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ফেডারেশন কোভেক্স আমাদের জন্য ১ কোটি ৯ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন নির্ধারণ করে রেখেছে। মার্চে এই ভ্যাকসিন আসার কথা থাকলেও তা এখন জুন-জুলাই পর্যন্ত গড়াতে পারে। এর বাইরেও তাদের মাধ্যমেই আরো ৬ কোটি ৯০ লাখ ডোজ পাওয়ার কথা। এসব পেলে আমাদের কোনো সংকট থাকবে না। কিন্তু এর জন্য আমাদের বসে থাকলে চলবে না, অন্যান্য উেসর সন্ধান দ্রুত চালাতে হবে। যারা ইতিমধ্যে প্রথম ডোজ পেয়েছেন তাদের দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করতে হবে, তা না হলে প্রথম ডোজের কার্যকারিতা থাকবে না।
যেহেতু রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে, সেহেতু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে দ্রুত সুবিন্যস্ত আরো বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। সমন্বিত কার্যক্রম চালানোর ওপর জোর দিতে হবে। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও এক্ষেত্রে সমধিক। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে করোনা রোগীর চিকিত্সায় যুক্ত করতে হবে এবং তা সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণ তদারকিতে চালাতে হবে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতাও আমলে রাখতে হবে। একই সঙ্গে এ-ও সতর্ক নজর রাখা জরুরি—কোভিড-ননকোভিড সব রোগীই যাতে যথাযথ চিকিত্সাসেবা পান। ভ্যাকসিন কার্যক্রমে আমাদের সাফল্য রয়েছে। অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধি নির্মূলে ভ্যাকসিন কার্যক্রম সফলতার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন। করোনা ভ্যাকসিনের ক্ষেত্র আমরা সফল হব, তাই আশা করি। তবে সব ব্যবস্থাপনা প্রশ্নমুক্ত রাখতেই হবে।
গত বছর লকডাউনের সময় সরকার নানারকম সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি চালু করেছিল। এর কিছু কিছু এখনো চালু রয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ফের এদিকে সরকারের দৃষ্টি রাখতে হবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ও দরিদ্রদের কল্যাণে সরকারের মহানুভবতা অতীতের মতোই আমরা প্রত্যাশা করব। চলমান এই দুর্যোগ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি নির্দেশনা সবাইকে পুঙ্খনুপুঙ্খ মান্য করার পাশাপাশি সরকারকে জনগণের সহায়তা করা জরুরি। সবার সমন্বিত চেষ্টাই হোক—দুর্যোগ-দুর্বিপাক মুক্তির শক্তি। মানুষ সহায়তা না করলে সরকারের কোনো ইতিবাচক উদ্যোগই সফল হবে না। কোনোভাবেই যেন কারোর উদাসীনতা-স্বেচ্ছাচারিতায় স্বাস্থ্যবিধি মুখ থুবড়ে না পড়ে। অবহেলায়-উদাসীনতায় ইতিমধ্যে সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেছে; কিন্তু তা যাতে আর স্ফীত না হয়, সেই লক্ষ্যেই থাকুক আমাদের সব প্রচেষ্টা।
নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থায় কোনো ছাড় দেওয়া যাবেই না। গত বছর মার্চের পর ভয়াবহভাবে করোনা ছড়িয়েছিল ইতালি প্রত্যাগতদের চলাচলে নিয়ন্ত্রণ-নিয়ম রক্ষা না করার কারণে। এমনটি যেন ফের না ঘটে। স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে না মানলে আমাদের সামনে আরো বড় বিপদ অপেক্ষা করছে—অপ্রিয় হলেও এটাই বাস্তবতা। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মূলমন্ত্র স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে আমরা কেউ যেন কোনো ছাড় না দিই। ইতিমধ্যে করোনার ধরন পরিবর্তন নিয়ে জনস্বাস্থ্যবিদরা সতর্কবার্তা দেওয়ার পাশাপাশি করণীয় সম্পর্কে বলেছিল। স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে মানবিকতার মধ্য দিয়েই কঠোর হতে হবে। আমরা যেন এসব বিষয় স্মরণে রাখি। এই বৈশ্বিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বের অনেক দেশই সফল হয়েছে শুধু যথাযথ নিয়মবিধি অনুসরণ করার কারণে। সচেতনতাই এই মহামারি রোধে অন্যতম কার্যকর পন্থা। ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন কোনোভাবেই না হয়। চিকিত্সাসেবা প্রাপ্তির পথ মসৃণ করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে নতুন কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে সেবার পরিসর আরো বিস্তৃতকরণে মনোযোগ বাড়াতে হবে। আমাদের সাধ্য সীমিত তবুও সরকারের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি নেই। প্রয়োজন দায়িত্বশীল সবাইকে স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা।
লেখক : অধ্যাপক, সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: