আজ: ১৫ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার, ২রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৩রা রমজান, ১৪৪২ হিজরি, সকাল ৭:০৬
সর্বশেষ সংবাদ
মতামত, সম্পাদকীয় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার QUAD সম্মেলন: কিছু কথা

যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার QUAD সম্মেলন: কিছু কথা


পোস্ট করেছেন: অনলাইন ডেক্স | প্রকাশিত হয়েছে: ১৯/০৩/২০২১ , ৮:২৫ অপরাহ্ণ | বিভাগ: মতামত,সম্পাদকীয়


এই প্রথম গত ১২ মার্চ, ২০২১ সালে QUAD (QUADrilateral Security Dialogue) নেতারা ভার্চুয়াল সম্মেলন আয়োজন করেন। যদিও QUAD নতুন কোন ধারণা নয় বরং এটা জাপানের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে, কিন্তু এপর্যন্ত সব সম্মেলন হয়েছিল মন্ত্রী পর্যায়ে। এই প্রথম এই সম্মেলন হল রাষ্ট্রের প্রধান পর্যায়ে। এ কারনে এবার এটা অনেক গুরুত্ব বহন করছে। উপরন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবার অনেক আগ্রহ নিয়ে সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছিল।

মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের প্রশাসন এ বছর হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেছে অন্যতম এই লক্ষ্যে যে ইন্দো-প্যাসিফিক জুড়ে চীনের ভৌগলিক দাবী প্রতিহত করতে তারা তাদের মিত্রদেরকে ঐক্যবদ্ধ করবে।

বাইডেন এই লক্ষ্যের দিকে তার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় যে পদক্ষেপ নিয়েছেন তা হল তিনি QUAD-এর নেতাদের নিয়ে একটি ভার্চুয়াল সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার ভঙ্গুর জোটকে পুনরুজ্জীবিত করলেন – যাকে বেইজিং “বিষাক্ত” শীতল যুদ্ধের মানসিকতার প্রতীক হিসাবে অভিহিত করেছে।

ওয়াশিংটন বলেছিল, কোভিড -১৯, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং জলবায়ু সংকটই হবে আলোচনার বিষয়বস্তু, কিন্তু নয়াদিল্লি বলেছে যে তাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জো বাইডেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদ সুগা এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের সাথে একটি “মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক গঠন” নিয়ে আলোচনা করবেন।

এই বিবৃতিতে অবশ্যই ‘চীন’এর নাম উল্লেখ ছিল না। তবে এটি ছিল এশীয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তির উত্থানকে লক্ষ্য করে যা ছিল ২০১৭ সালে কোয়াডের পুনরুজ্জীবনের কারণ।

QUAD বা Quadrilateral Security Dialogue একটি অনানুষ্ঠানিক কৌশলগত ফোরাম, যা অর্ধ-নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলন, তথ্য আদান প্রদান এবং সামরিক মহড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ন্যাটোর মতো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট না হলেও, এটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনা প্রভাব এবং তার কথিত আগ্রাসনের সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপ হিসাবেই দেখা হচ্ছে।

যদিও সদস্য দেশগুলো আরও অন্যান্য বিষয়গুলোতে জোর দিয়েছিলেন যেমন করোন ভাইরাস মহামারী সম্পর্কে সাম্প্রতিক সহযোগিতা, তবুও QUAD দেশগুলির দ্বারা সামরিকভাবে ঘেরাও হওয়ার সম্ভাবনা বেইজিংয়ের নজর এড়িয়ে যায়নি।

এবং এটি আশ্চর্যের কিছু নয়।

মঙ্গলবার মার্কিন সেনাবাহিনীর ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের প্রধান ইউএস নেভি অ্যাডমিরাল ফিলিপ ডেভিডসন QUAD-কে ইন্দো-প্যাসিফিকের “গণতন্ত্রের হীরখণ্ড” বলে মন্তব্য করেছেন।  তিনি আশা করসেন যে এই সংগঠন বড় কিছু একটা করবে।

ডেভিডসন  বলেছেন-“শুধু নিরাপত্তার ক্ষেত্রেই নয়, বরং আমরা কীভাবে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি, টেলিযোগাযোগ এবং 5 জি এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, বৈশ্বিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারি”।

কোয়াডের জন্য চারটি ক্ষেত্র

যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রতিরক্ষা সচিব জেমস ম্যাটিসসহ স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্ষণশীল HOOVER INSTITUTION এর চারজন ফেলো বলেছিলেন যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে QUAD গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে: সমুদ্র সুরক্ষা, সরবরাহ চেইন সুরক্ষা, প্রযুক্তি এবং কূটনীতি।

সামুদ্রিক সুরক্ষায়, কোয়াড সদস্যরা পর্যাপ্ত নৌবাহিনী সরঞ্জাম আনতে পারে যা মার্কিন নৌবাহিনীকে চীনের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের তীব্রতা মোকাবেলায় সহায়তা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের একটি বিমানবাহি রণতরী রয়েছে, আর জাপানের রয়েছে মানসম্পন্ন ডেসট্রয়ার এবং সাবমেরিনের বহর।

সরবরাহ চেইন সুরক্ষার বিষয়ে, হুভার ইনস্টিটিউশনের ফেলোরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে চিকিত্সার সরঞ্জাম সরবরাহ ও ওষুধের উৎপাদনের ক্ষেত্রে চীনের যে সুবিধা রয়েছে তা ধ্বংস করতে চারটি বৃহত অর্থনীতির দেশ শিল্প ও উত্পাদন প্রকল্পগুলিকে সুবিধাজনকভাবে ব্যবহার করতে পারে কারণ কোভিড মহামারী রোগের সময় এই বিষয়ে চীনের ব্যপারে সমস্যাযুক্ত বলে কিছু দেশ অভিযোগ করেছে।

প্রযুক্তির বিষয়ে তারা বলেছেন, QUAD সদস্যদের তথ্য সুরক্ষা এবং নতুন সিস্টেম বিকাশ করার জন্য সংস্থানগুলির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা দরকার যাতে চাইনিজ হার্ডওয়্যার বা সফ্টওয়্যার প্রয়োজন না হয়  যা সুরক্ষার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করছে।

এবং কূটনীতি সম্পর্কে হুভার ইনস্টিটিউশনের ফেলোরা বলেছিলেন যে আমেরিকা এখন ইন্দো-প্যাসিফিকের আশেপাশের দেশগুলির কাছে যতটা প্রভাব রাখে তার চেয়ে জাপান, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়া আরও বেশি প্রভাব রাখে।

অঞ্চলের অনেক দেশ, বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীনের শক্তির বিরুদ্ধে ভারসাম্য বজায় রাখতে কোয়াড সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতাকে স্বাগত জানাবে।

তবে এর কোনওটি হওয়ার কোনও নিশ্চয়তা নেই। কারণ,  QUAD-এর প্রথম অবতারনটি ২০০৭ সালে চীন থেকে চাপের মুখে পড়েছিল এবং ফাটল ধরেছিল। চীন এই সংস্থাটিকে চিত্রিত করেছে তাকে ঘিরে রাখার প্রয়াস হিসাবে এবং বেইজিং এই তিন মার্কিন অংশীদারকে যে কোনও শক্ত অবস্থান থেকে সরিয়ে রাখার জন্য অর্থনৈতিকভাবে প্রতিশোধ নিতে পারে বলে সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি কোয়াড এখন চীনে লাগাম লাগানোর চেষ্টা করে, বেইজিং তাদের প্রতিশোধ নেবে। এটি ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রতিশোধের সম্ভাবনা সহ চীনের সাথে আরও উত্তেজনা এনে দেবে। এটি তিনদেশের পক্ষেই কঠিন বলে বিবেচিত হতে পারে। এদের সবার জন্যই চীন বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার।

বেইজিংয়ের জন্য স্বাচ্ছন্দ্য

র‌্যান্ড বিশ্লেষক হিথ উল্লেখ করেছেন যে কোয়াড একটি ‘ঐক্যফ্রন্ট’ থেকে অনেক দূরে। তিনি বলেন, সদস্যদের মধ্যে স্বার্থের ভিন্নতা চীনের স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা হতে পারে।

“এটি একটি অনানুষ্ঠানিক সমাবেশ যার খুব সামান্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। এই অর্থে, কোয়াড অবশ্যই একটি ‘এশীয়ান ন্যাটো’ নয়”-তিনি শীতল যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আনুষ্ঠানিক পশ্চিমা জোটকে উল্লেখ করে বলেছিলেন।

“কোয়াড সদস্যরা চীন সম্পর্কে এবং নিয়ম-ভিত্তিক শৃঙ্খলা বহাল রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে, তবে চীন সম্পর্কে কী করা উচিত সে বিষয়েও তাদের ঐক্যমতের অভাব রয়েছে। সদস্যদের মধ্যে স্বার্থের পার্থক্য রয়েছে, ভারত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভারত মহাসাগরের দিকে মনোনিবেশ করবে যখন অস্ট্রেলিয়া এবং জাপান দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন”-হিথ বলেছেন।

খেলার সঙ্গে তুলনা করলে বলা যায়, বেইজিং বর্তমানে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করে।

লিখেছেন: প্রকৌশলী জাকারিয়া প্রামানিক

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: