আজ: ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার, ১৫ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৬ই রজব, ১৪৪২ হিজরি, রাত ৪:১৭
সর্বশেষ সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন বাংলাদেশের চার মূল নীতি: সমাজতন্ত্রের স্বরূপ সন্ধানে

বাংলাদেশের চার মূল নীতি: সমাজতন্ত্রের স্বরূপ সন্ধানে


পোস্ট করেছেন: অনলাইন ডেক্স | প্রকাশিত হয়েছে: ১৩/০২/২০২১ , ১২:৪৫ অপরাহ্ণ | বিভাগ: বিশেষ প্রতিবেদন


১৯০ বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তিরস্বাদ আস্বাদনের জন্য, ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া ভারতবর্ষের পাকিস্তান অংশের সঙ্গে যুক্ত হলাম আমরা। কিন্তু সেই ধর্মের মোহ কাটতে খুব বেশি সময় লাগলো না। ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, হাজার মাইল দূর থেকে, পাকিস্তানিরা মাত্র দুই যুগের মধ্যে আমাদের সোনার বাংলাকে শ্মশানে পরিণত করলো। পাকিস্তান গঠনের মাত্র দেড় যুগের মাথায় বাংলায় খাদ্য ঘাটতি দেখা দিলো। যে বাংলায় আগে খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকতো, পশ্চিম পাকিস্তানিদের সার্বিক শোষণে ১৯৬৪ সালে সেখানে খাদ্য আমদানি করতে হলো। মুষ্ঠিমেয় কয়েকটি পরিবারের হাতে রাষ্ট্রের যাবতীয় সম্পদ কুক্ষিগত হতে থাকলো। এই শ্রেণিটার বড় পুঁজিপতিদের অংশটাকে ইতিহাসে বাইশ পরিবার বলে আখ্যায়িত করা হয়। রাষ্ট্রের ৯০ শতাংশ সম্পদ মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে চলে যায়। একসময় যে বঙ্গবন্ধু তার পূর্বসূরীদের সঙ্গে পাকিস্তান আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, দেশ ভাগের কিছুদিনের মধ্যেই তার কাছে পুরো ধোঁকাবাজিটা স্পষ্ট হয়ে গেলো। তখন থেকেই তিনি সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলের জন্য ভাবতে থাকলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিতের মুখে হাসি ফোটানের জন্য দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সংস্কারের পরিকল্পনা করতে থাকেন তৎকালীন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। সমাজতন্ত্রের ধারণটা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে তখন থেকেই যুক্ত। দেশ স্বাধীনের পর সংবিধানের রাষ্ট্রের চার মূল নীতির সঙ্গে এটি হুট করেই যুক্ত হয়নি। এর ঐতিহাসিক ভিত্তি বাস্তবতার অনেক গভীরে প্রোথিত।
সমাজতন্ত্র বলতে অনেকেই মনে করেন-ধর্মহীনতা, অথবা চীন বা রাশিয়ার মতো পৃথিবী থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন আলাদা রাষ্ট্রব্যবস্থা। কিন্তু এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য, স্বাধীনতাযুদ্ধে পরাজিত শক্তি এবং একটি পুঁজিবাদী একটি শ্রেণি আমাদের দেশীয় সমাজতন্ত্রের বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অপপ্রচার চালিয়েছে। যেকারণে, এই বিষয়ে কেউ খুব একটা কথা বলতে চান না। আসুন আজ আমরা এই বিষয়েই কথা বলবো।

কারণ, বঙ্গবন্ধু যে সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন, স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেই সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাই চেয়েছিল এই বাংলার জনগণ। আর আপামর জনতার সেই আকাঙ্ক্ষার ওপরে ভিত্তি করেই পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ১৯৭০ সালে একচেটিয়াভাবে জয় লাভ করেছিল আওয়ামী লীগ। তার আগে, প্রাদেশিক নির্বাচনে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের কারণও ছিল একই। কৃষক-শ্রমিকরা অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্নে বিভোর হয়ে টাকাওয়ালা জমিদার-জোতদারদের ভোট না দিয়ে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছিল যুক্তফ্রন্টকে। এমনকি স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকে মানুষ এককভাবে ভোট দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু যতোবার নৌকা মার্কায় ভোট চেয়েছেন, ততোবার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে। কারণ বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনজুড়ে শোষিত নিপীড়িত মানুষের দুঃখ লাঘবের কথা বলেছেন। সামাজিক শোষণ থেকে তাদের মুক্তির কথা বলেছেন। সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কৃষক-শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের ভাগ্য পরিবতর্দন করতে চেয়েছেন। এবং এই বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধুর ওপর আস্থা রেখেছিল বলেই বারবার আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে। এমনকি এই অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তির জন্য পাকিস্তানি জান্তাদের আধুনিক ও ভারী অস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রায় খালি হাত প্রতিরোধ গড়ে তুলতেও দ্বিধা করেনি আপামর জনতা।
দেশ স্বাধীনের আগে ও পরে, এই ভূমির সাত কোটি মানুষের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য আমৃত্যু কাজ করেছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার পর তাই শাসনতন্ত্র রচনার সময় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চার মূলনীতি ঠিক করেন তিনি। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার পাশাপাশি তিনি এখানে যুক্ত করে দেন সমাজতন্ত্র। এই সমাজতন্ত্রকে বিশ্বের অন্য কোনো দেশের ধারণার সঙ্গে মেলালে হবে না। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রচলনের মাধ্যমে দেশের ৯০ ভাগ শোষিত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন- এটা ছিল বঙ্গবন্ধুর মৌলিক চিন্তা থেকে আসা একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে সাম্যভিত্তিক ও মানবিক সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে করতে চাওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশের সমাজতন্ত্র মানে শোষিতের গণতন্ত্র
এ ব্যাপারে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার সমাজতন্ত্রের মূল কথা হলো শোষণহীন সমাজ। সমাজতন্ত্র আমরা দুনিয়া থেকে হাওলাত করে আনতে চাই না। একেক দেশ একেক পন্থায় সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়েছে। রাশিয়া যে পন্থা অবলম্বন করেছে, চীন তা করে নাই, সে অন্যদিকে চলেছে। রাশিয়ার পার্শ্বে বাস করেও যুগোস্লাভিয়া, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া তাদের দেশের এনভারমেন্ট নিয়ে, তাদের জাতির ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে, সমাজতন্ত্রের অন্য পথে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যান- ইরাক একদিকে এগিয়ে চলেছে, আবার মিসর অন্যদিকে চলেছে। বিদেশ থেকে হাওলাত করে এনে কোনোদিন সমাজতন্ত্র হয় না; তা যারা করছেন, তারা কোনোদিন সমাজতন্ত্র করতে পারেন নাই। কারণ– লাইন, কমা, সেমিকোলন পড়ে সমাজতন্ত্র হয় না। সেজন্য দেশের এনভারমেন্ট, দেশের মানুষের অবস্থা, তাদের মনোবৃত্তি, তাদের কাস্টম, তাদের আর্থিক অবস্থা, তাদের মনোভাব, সব কিছু দেখে স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়ে যেতে হয়।’
আর আগে, স্বাধীনতা অর্জনের পর পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরেই নতুন রাষ্ট্রের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর, ১৪ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘শোষণমুক্ত দেশ, তথা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠাই আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য।’ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিক পন্থায় বিশ্বাসী। তাছাড়া বিভিন্ন দেশের অবস্থা বিভিন্ন রকম। বাংলাদেশকে বাংলাদেশের অবস্থা অনুযায়ী পন্থা গ্রহণ করতে হবে।’ এরপর থেকে প্রতিটি জনসভায়, সংসদে, বৈঠকে সবখানেই ‘বাংলাদেশ স্টাইলের সমাজতন্ত্র’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতেন বঙ্গবন্ধু। গণতান্ত্রিক সরকার কাঠামোতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এই প্রক্রিয়াকে বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘শোষিতের গণতন্ত্র’।
প্রথম স্বাধীনতা দিবস তথা ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চের ভাষণে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার সরকার অভ্যন্তরীণ সমাজ বিপ্লবে বিশ্বাসী। পুরাতদন সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। অবাস্তব তাত্ত্বিকতা নয়। দেশের বাস্তব প্রয়োলাজনের ভিত্তিতে পুরনো সামাজিক কাঠামো ভেঙে দিয়ে নতুন সমাজ গড়তে হবে।’
১৯৭২ সালের ৯ মে রাজশাহীতে এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সমাজতন্ত্র ছাড়া বাংলার মানুষ বাঁচতে পরবে না, সেজন্য সমাজতন্ত্র কায়েম করার উদ্যোগ নিয়েছি। কোনো লোক একশ’ বিঘার ওপর জমি রাখতে পারবে না। উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিলি করে দেওয়া হবে।’
মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্য অর্জনের জন্য দেশ স্বাধীনের পর তিন বছরের বেশি সময় অক্লান্ত চেষ্টা করেছেন বঙ্গবন্ধু। এরমধ্যে জাতীয়করণ করেছেন ব্যাংক, বীমা, পাটকল, সুতাকল, চিনিকল, অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌযানের বৃহদংশ, বাংলাদেশ বিমানসহ আরও বেশকিছু ক্ষেত্র। যেসব বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান আগে ছিল গুটিকয়েক ব্যক্তির, সেগুলোকে জাতীয়করণ করে সাত কোটি বাঙালিকে এসবের মালিকানা দিয়েছেন তিনি। উদ্যোগ নিয়েছেন দেশের ৬৫ হাজার গ্রামে সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। যাতে জমির মালিক পরিবর্তন হবে না, কিন্তু সেখানে শ্রম দেবে বেকার-কৃষক-শ্রমিক সবাই, সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহ হবে সার-ওষুধ-বীজ প্রভৃতি। ফলে উৎপাদন বাড়বে। ফসল হবে তিন ভাগ। একভাগ জমি মালিকের, একভাগ মেহনতি মানুষের আর আরেকভাগ রাষ্ট্রের। এভাবে কৃষিকে আধুনিকায়ন করে ফলন অন্তত তিনগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। যাতে উৎপাদিত ফসল তিন ভাগ হওয়ার পরও কারও ভাগে কম না হয়। প্রকৃতপক্ষে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের ছক ছিল এটি। কিন্তু এর বাস্তবায়নের আগেই একদল বর্বর খুনির হাতে পরিবারসহ প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধু। ভূলুণ্ঠিত হয় সংবিধান। দুঃখী মানুষের দৃষ্টি থেকে শত বছরের কষ্টের ছাপ দূর করার যে মহান পরিকল্পনা নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, তা আর বাস্তবায়িত হলো না। রাষ্ট্রের চার মূলনীতির জায়গায় ‘সমাজতন্ত্র’ কাগজে-কলমে থাকলেও, আদর্শটা পুরোপুরি হারিয়ে গেলো। সামরিক জান্তা, উগ্রবাদী ও দখলদার পুঁজিবাদীদের আগ্রাসনে সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত মানুষের ভাগ্য আবারও অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো।
অথচ, বৈষম্যের শিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ এই শোষিত মানুষগুলোর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম। কিন্তু স্বাধীনতার পর উগ্রবাম ও স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্রের কারণে ক্ষমতালিপ্সু একটা টাউট শ্রেণি গড়ে ওঠে। যার ফলে, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধুর নেওয়া উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। একারণে নাম-কা-ওয়াস্ত চলমান থাকা গণতন্ত্রের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে বলেছেন, ‘আমরা শোষিতের গণতন্ত্র চাই। যারা রাতের অন্ধকারে পয়সা লুট করে, যারা বড় বড় অর্থশালী লোক, যারা বিদেশিদের পয়সা ভোট কেনার জন্য দেয়, তাদের গণতন্ত্র নয়, শোষিতের গণতন্ত্র।’ এই শোষিতের গণতন্ত্রই হলো বাংলাদেশের প্রক্ষাপটে সমাজতন্ত্র তথা সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করা, যা আমাদের সংবিধানের চার স্তম্ভের একটি।
এইা লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বঙ্গবন্ধু যেমন কৃষক-শ্রমিকদের প্রতি উৎপাদন বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছিলেন, তেমনি সরকারি কর্মচারিদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও মৌলিক পরিবর্তন আনতে বলেছেন। ইয়রেজ বা পাকিস্তানি আমলের ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও বঙ্গবন্ধু
রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন বঙ্গবন্ধু্। তরুণ বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকারের পক্ষে আন্দোলন করে ছাত্রত্ব হারিয়েছেন। ইংরেজদের শোষণ থেকে মুক্তির জন্য দেশভাগের সময় পূর্ববর্তী নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তান গঠনের পক্ষে ছিলেন তিনি। কিন্তু কিছুদিন পরেই তিনি বুঝতে পারেন, পাকিস্তানিরাও বাঙালিকে দাসত্বের শৃঙ্খল পড়িয়ে ফেলেছে। সেসময়কার অনুভূতি সম্পর্ক বঙ্গবন্ধু পরবর্তীতে স্মৃতি থেকে লিখেছেন, মুসলমানের দেশের মোহ কেটে গেছে। শোষণ আর নিষ্পেষণে সম্প্রদায়িকতা নিগড় থেকে মুক্তি পেতে বাঙালির মমনে তখন জেঁকে বসেছে সমাজতন্ত্র।
আর সময়টাও ছিল তখন বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্রের বিকাশের। চীন স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৯ সালে আর পাকিস্তান ১৯৪৭ সালে। অথচ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দ্রুত নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা পরিবর্তন করে চীন। কিন্তু পাকিস্তানিদের শোষণে স্বয়ংসম্পূর্ণ পূর্ব বাংলার মানুষ তখন ক্ষুধা-দারিদ্রে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, ১৯৫৬ সালে শান্তি পরিষদের এক সম্মেলনে চীন দেশ সফরের ঘটনা বঙ্গবন্ধুর মনকে আরো বেশি আলোড়িত করে। এ বিষয়ে ‘আমার দেখা নয়া চীন’ গ্রন্থে বিস্তারিত লিখেছেন বঙ্গবন্ধু। ওই সফরে প্লেনে ও ট্রেনে করে চীন ভ্রমণের এক পর্যায়ে তিনি চমকে যান। তিনি দেখেন, দেশটি বাংলাদেশের মতোই সুজলা-সুফলা। বাংলাদেশের মতোই তারাও শোষণের শিকার হয়েছে একসময়। ইংরেজ ও জাপানিরা তাদের অনেক কিছুই ধ্বংস করেছে। তবুও তারা স্বাধীনতা লাভের কয়েক বছরের মধ্যেই কীভাবে নিজেদের বদলে নিচ্ছ! সেখানকার রাষ্ট্রদর্শন, শ্রমিকবান্ধব নীতি, শিল্পকারখানার বিকাশ প্রভৃতি তাকে মুগ্ধ করে।
তখন কমিউনিস্ট সরকার চীনে। তাদের নিয়ে অনেক সমালোচনাও আছে। তবে তাদের উন্নয়নের মহাযজ্ঞ দেখে মুগ্ধ বঙ্গবন্ধু লেখেন, ‘আফিং খাওয়া জাত যেন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। আফিং আর কেউ খায় না। আর ঝিমিয়েও পড়ে না। এদের মনে আশা এসেছে, হতাশা আর নাই। তারা আজ স্বাধীন দেশ হয়েছে, দেশের সব বিছুই আজ জনগণের।’
চীনের শ্রমিকবান্ধব নীতি বঙ্গবন্ধুকে মুগ্ধ করলেও বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে চীনের মতো সমাজতন্ত্র কায়েমে বিশ্বাসী ছিলেন না। এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘আমি কমিউনিস্ট নই। আমি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না।’
প্রকৃতপক্ষে, এই ভ্রমণ বঙ্গবন্ধুকে অনেক উদ্বেলিত করলেও সমাজকাঠামো বদলে দেওয়ার চিন্তা এখান থেকেই শুরু নয়। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই জনবান্ধব রাজনীতির হাতেখড়ি হয় বঙ্গবন্ধুর। তারুণ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন তিনি। তৎকালীন ভারতবর্ষেও এই দুই বর্ষীয়ান নেতার জনসমর্থন ছিল কৃষকদের মধ্যে। পরে পাকিস্তানবিরোধী রাজনীতির বিকাশকালে ১১ দফাতেও কৃষক-শ্রমিকদের দাবিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয়তাবোধের তীব্র বিকাশকালেও শোষণহীন সমাজের দাবি ছিল সবখানে। বঙ্গবন্ধুর হাতে গঠিত ছাত্রলীগসহ অধিকাংশ ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্য থেকে পুঁজিবাদবিরোধী উচ্চারণ আসতে থেকে। বিদেশি পূুঁজি বাতিল ও বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তফ্রন্টের দাবিতেও যোগ হয় জমিদারি উচ্ছেদ ও পাটকল জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি।
১৯৬৯ সালের ১১ দফাতেও ব্যাংক-বীমা-পাটশিল্প জাতীয়করণের কথা বলা হয়। অর্থনৈতিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকল্পে সমাজতন্ত্র কায়েমের কথা বলা হয় ১৯৬৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রচারিত নীতি ও কর্মসূচিতেও।
১৯৭০ সালে নির্বাচনের সময়েও আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোতে সমাজতন্ত্রের কথা যুক্ত হয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জুন মাসে আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই কাউন্সিল থেকে ঘোষণা করা হয়, ‘একচেটিয়া পূুঁজিবাদ, সামন্তবাদ, জমিদারি, জোতদারি, মহাজনি প্রথা বিলোপ সাধন করে; গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রবর্তন করে; মানুষের মধ্যে সাম্যনীতি কায়েম করা হবে।’ এই ঘোষণার পর থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি অভিযান শুরু হয়। এরপর প্রতিটি নির্বাচনি ভাষণেও দেশের সম্পদকে জনগণের মালিকানায় আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শোষণ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন এবং সাম্যভিত্তিক সমাজব্যবস্থা কায়েমের মূলমন্ত্রকেই বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজতন্ত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়।

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: