আজ: ২৬শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার, ১২ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৩ই জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি, বিকাল ৩:৫৫
সর্বশেষ সংবাদ
জাতীয়, মতামত অধিকার মর্যাদা বৈষম্যের শিকার, প্রতিষ্ঠা হোক অভিবাসীদের অধিকার

অধিকার মর্যাদা বৈষম্যের শিকার, প্রতিষ্ঠা হোক অভিবাসীদের অধিকার


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ১৭/১২/২০২০ , ১:০২ অপরাহ্ণ | বিভাগ: জাতীয়,মতামত


২০০০ সালের ২ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৮ ডিসেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই মহতী দিবসে লক্ষ লক্ষ প্রবাসী কর্মীকে সশ্রদ্ধ সালাম ও শুভেচ্ছা জানাই। স্মরণ করি আমাদের সতীর্থ অভিবাসী ভাই ও বোনদের। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি তাঁদের যাঁরা বিদেশ-বিভুইয়ে অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে অকালে প্রাণ হারিয়েছে স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিকভাবে। প্রবাসী কর্মীর সকলেই বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ করে দেশের উন্নয়নে এবং একই সঙ্গে কর্মরত দেশের উন্নয়নেও অবদান রাখছেন, তাঁদের এই ত্যাগ চির অম্লান। কেবল বাংলাদেশ নয় সারাবিশ্বে প্রতি মুহূর্তে নিরাপদ কিংবা উন্নত জীবনের সন্ধানে মানুষ নিজের দেশ ছাড়ছে। অভিবাসী হিসাবে নিজেদের সম্পৃক্ত করছে। শরিক হচ্ছে এই দিবস প্রক্রিয়ায়।
উনিশ শতকের শেষার্ধে পশ্চিমা দেশগুলোয় খামার উৎপাদন, খনিজ আহরণ, রেলরাস্তা নির্মাণ ইত্যাদি বিপুল প্রসারে সাময়িকভাবে সস্তা ও অদক্ষ শ্রমিকের নজিরবিহীন চাহিদা সৃষ্টি হয়। শুরু হয় এক দেশ থেকে আরেক দেশে শ্রমজীবীদের অভিপ্রয়াণ। বিশ শতকের শুরুতে আমেরিকায় অভিবাসী শ্রমজীবীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। দক্ষিণ ইউরোপ, এশিয়া ও মেক্সিকো থেকে এসে আমেরিকায় খামারে কাজ করতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে জার্মানে শ্রমিকের পরিমাণ যথেষ্ট না হওয়ায় ইউরোপের অন্যান্য দেশের নাগরিকদের আমন্ত্রণ জানাতে থাকে। কানাডার শ্রমিক চাহিদা পূরণে ষাটের দশকে ক্যারিবিয়ান দেশগুলো এবং সত্তরের দশকের প্রথমভাগে মেক্সিকো থেকে শ্রমজীবীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়। গত দশকের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রসার ইউনিয়নভূক্ত এক দেশ থেকে অন্য দেশে কাজের জন্য অভিপ্রয়াণের সুযোগ বেশাবেশি উন্মুক্ত হয়। ফিনল্যান্ডে নির্মাণ ও পরিবহন কাজে বুলগেরিয়া, কসোভো ও এস্তোনিয়া থেকে শ্রমজীবীরা নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ পান। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশীরাও কাজের জন্য বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে কর্মজীবীরা এসে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিবাসী কর্মজীবীদের মধ্যে অর্ধেকের কাছাকাছি এশিয়া মহাদেশের।

অভিবাসীদের নিয়ে কয়েক বছর ধরেই জোর আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অভিবাসী গোষ্ঠী হলো বাংলাদেশের। বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি নাগরিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশিদের চেয়ে বেশি অভিবাসী হলো ভারত, মেক্সিকো, রাশিয়া ও চীনের। ‘পিপল অন দ্য মুভ: গ্লোবাল মাইগ্রেশনস ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড অপরচুনিটি’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক গবেষণায় ‘ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউট’ এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে সারা বিশ্বে ২৪ কোটি ৭০ লাখ মানুষ নিজ দেশে অভিবাসী জীবন যাপন করছেন। ১ কোটি ৬০ লাখ ভারতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাস করেন। ভারতের পরের স্থানে আছে মেক্সিকো। মেক্সিকোর অভিবাসী সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ। এ ছাড়া রাশিয়ার ১ কোটি ১০ লাখ ও চীনের ১ কোটি মানুষ অভিবাসী। আর বাংলাদেশের পরের পাচঁটি দেশ হলো যথাক্রমে সিরিয়া, ইউক্রেন, পাকিস্তান, ফিলিপাইন ও আফগানিস্তান। সারা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৩ দশমিক ৪ শতাংশই অভিবাসী। বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ উন্মুক্ত হয় সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ১৪ হাজার শ্রমিক কাজ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়েছিল। আর ওই বছর প্রবাসী আয় হয় পাঁচ কোটি ডলার। এরপর সব মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশী বিশ্বের ১৪০টি দেশে গেছেন। তৈরি পোশাকের পর জনশক্তি রফতানিই বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত। এই করোনা মহামারীর বিধ্বস্ত বিশ্ব অর্থনীতির সময়েও রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স আসায় দেশের সার্বিক অর্থনীতি নিয়ত চাঙ্গা থাকছে।
জনশক্তি রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যেখানে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় নিবেদিত রয়েছে, যার নাম প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। কিন্তু বাস্তবে যাঁরা জাতীয় অর্থনীতিতে এত অবদান রাখছেন, সেইসব প্রবাসীর কল্যাণে খুব কমই অবদান রাখছে এ মন্ত্রণালয়। যাঁরা রেমিট্যান্সকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে, সেসব লাখো প্রবাসীর গল্প কিন্তু খুবই দুঃখজনক ও ট্র্যাজিক। বিশ্বে ক্রমবর্ধমান অভিবাসী ¯্রােত বাংলাদেশের জন্য অনেকটা উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশে অভিবাসী ও শরণার্থী বা উদ্বাস্তদের নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু হয়েছে। অভিবাসী ঠেকাতে ব্রিটেনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট পড়েছে। আমেরিকায় অবৈধ অভিবাসন বন্ধে ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেয়া শুরু করেছিল। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি ও প্রাচীর নির্মাণে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে শুধু লাতিন আমেরিকা, এশিয়া বা অন্যান্য দেশ থেকে আগত বৈধ কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীদের আমেরিকা ছাড়তে হচ্ছে তা নয়, এত দিন নির্ভযে থাকলেও ইউরোপের নাগরিকরা উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন যে, তারাও নিরাপদ নন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি অভিবাসী মধ্যপ্রাচ্যে। ওখানেও প্রণয়ন করা নতুন নিয়মের আওতায় অধিক সংখ্যক খ-কালীন শ্রমিক রাখতে পারবে না কোম্পানিগুলো। ফলে তারাও শুধু যোগ্যদের রেখে বাকিদের বিদায় করে দিচ্ছে। কেবল মধ্যপ্রাচ্য থেকেই বিতারিত হয়ে দেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছে কয়েক লাখ অভিবাসী। বিপরীতে বিগত কয়েক বছর আমাদের জনশক্তি রফতানিতে ব্যাপক ধস নেমেছে। আমাদের জনশক্তি রফতানির শস্যক্ষেত্র বলে বিবেচিত মধ্যপ্রাচ্যে আমরা ক্রমাগতভাবে পিছিয়ে পড়েছি। সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কোন দেশেই আমরা পূর্বের মত জনশক্তি রফতানি করতে পারছি না। এই সমস্ত দেশের অনীহার কারণে নতুন করে তো কর্মসংস্থানের সুযোগ মিলছে না বরং রিক্ত, নিঃস্ব হয়ে ফেরত আসতে হচ্ছে। অভিবাসী প্রেরণ টানাপোড়নের সময়ে বাংলাদেশের আঞ্চলিক উন্নয়ন বৈষম্যও ব্যাপকভাবে চোখে পড়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রবাসী আয় বাংলাদেশে যে কেবল বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়াচ্ছে তাই নয়, দারিদ্রবিমোচন ও উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চল থেকে অনেক কম মানুষ প্রবাসে গেছেন। আর ৮২ শতাংশ গেছেন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল থেকে। না যেতে পারা এই তিন অঞ্চলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। আমরা পোশাক রফতানিতে দ্বিতীয়, তাই আমাদের ‘দর্জির দেশ’ বলা হয়। বিদেশে আমাদের মানুষগুলো মেধা বিক্রি না করে শ্রম বিক্রি করে দেশে অনেক রেমিট্যান্স পাঠায়, তাই আমাদের ‘কামলার দেশ’ বলা হয়। আমরা চামড়া ও চামড়াজাত রফতানি করি; তাই আমাদের কেউ কেউ ‘মুচির দেশ’ বলে। ফিলিপাইন আমাদের তুলনায় মাত্র ২০ শতাংশ জনশক্তি রফতানি করে তিনগুণ বেশি রেমিট্যান্স অর্জন করে। কারণ তারা তাঁদের শ্রমিক বা জনশক্তিকে যুগের চাহিদামাফিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে বিদেশে পাঠায়।
অভিবাসন নিয়ে এখন থেকেই আমাদের একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আগামী ৫০ বছর ২০ কোটি লোক বিদেশ প্রেরণ করার উদ্যোগ নিতে হবে। এর মধ্যে ১৫ কোটি লোক পরিবার পরিজন নিয়ে স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাস করবে। তখন বেশি জনসংখ্যা কোনো দেশের জন্যই সমস্যা হবে না। যদি তা দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হতে পারে। আমাদের কিন্তু শ্রমবাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে হবে।
২০৭১ সালের মধ্যে ২০ কোটি লোক রফতানি এবং বিদেশে ১৫ কোটি স্থায়ী অভিবাসীর জন্য জনশক্তি রফতানিতে আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। শুধুমাত্র শ্রমিক রফতানি নির্ভর না করে কৃষি, খামার, পশুপালন, মৎস্য খামার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, সড়কযান, রেলযান, এয়ারলাইন, শিপিং লাইন, টেক্সটাইল, লেদার, প্রিন্টিং, সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, অস্ত্র শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নিউক্লিয়ার প্ল্যান, গভীর সমুদ্র থেকে মৎস্য আহরণ, সাগরে নোনা পানি বিভাজন করে বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও ক্যামিক্যাল উৎপাদন, হাউজিং, কন্সট্রাকশন ফার্ম, ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প, খনিজ লবণ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, শপিংমল, জুয়েলারি, কুরিয়ার, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, ফার্মিিসটিক্যালস, ইন্ডাস্ট্রিজ নতুন উদ্ভাবন, আবিস্কার, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ল্যাবরেটরি শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার আমদানি, রফতানি, ছোট, বড়, মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা প্রেরণ করার পরিকল্পনা আঁটতে হবে। গহীন, বন-জঙ্গল, দুর্গম মরুভূমি, পাহাড় পর্ব্বত, দ্বীপ, উপকূলে আস্থানা গড়ে তুলতে হবে। যুদ্ধের ময়দানে চিকিৎসা সেবা, ভালবাসা দিয়ে শান্তির পতাকা উড়াতে হবে। এই উচ্চবিলাসী স্বপ্নগুলো অর্জন করতে হলে জনশক্তি রফতানি অন্য দেশগুলো থেকে শিক্ষায়-দীক্ষায়, শ্রমে, মননে হতে হবে অগ্রগ্রামী। আগামী ৫০ বছরে ২০ কোটি লোককে সকল পেশা ও পণ্যভিত্তিক সুর্নিদ্রিষ্ট শিক্ষার জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
বিশ্ব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি প্রক্ষেপণ চিন্তায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। কারিগরি শব্দের ভূত বেড়াজাল ছিন্ন করতে হবে। বৈদেশিক চাহিদানির্ভর মানবিক শিক্ষা ব্যবস্থার মনোন্নয়ন সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস পালনের মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য হোক বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পরিত্যাক্ত আমাদের শিক্ষাকে কর্মনির্ভর করার স্বরূপ অনুসন্ধার করা।
লেখক: টেকসই উন্নয়নকর্মী
khanaranjanroy@gmail.com

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: