আজ: ২৪শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার, ১০ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১১ই জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি, ভোর ৫:০৩
সর্বশেষ সংবাদ
জাতীয়, মতামত পদ্মা সেতু একটি চেতনার নাম

পদ্মা সেতু একটি চেতনার নাম


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ১৪/১২/২০২০ , ১২:৩৫ অপরাহ্ণ | বিভাগ: জাতীয়,মতামত


বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা মহাকালের ব্যবধান ঘুচিয়ে দিলেন প্রমত্ত পদ্মার বুকে সেতু নির্মাণের মাধ্যমে। এক পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে তিনি বিশ্বব্যাংকের অন্যায় আচরণ প্রসঙ্গে আমাদের বলেছিলেন- এ ধরনের বাধা কিংবা চক্রান্তকে ভয় পাই না। আমার কাজ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন, সমগ্র দেশের উন্নয়ন। ইস্পাতের কাঠামোর কারণে ব্যয় কিছুটা বাড়বে, কিন্তু দেখতে সুন্দর হবে। আমরা মনের দিক থেকে যে কতটা শৈল্পিক তারও তো প্রমাণ রাখা চাই। ১৯৯৮ সালের ৪ জুন যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর শেষ অংশটি ঢালাইয়ের সময় অকুস্থলে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রকৌশলীদের সঙ্গে কাজ করছিলেন রাজমিস্ত্রীরা। ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুতে ইস্পাতের ৪১ নম্বর স্প্যানটি বসানোর দৃশ্য দেখেছি টেলিভিশনে। শিহরিত হওয়ার মতো ঘটনা যে!
বরিশালসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর অনেকেই বলেন- চলাচলের ক্ষেত্রে আমরা প্রকৃতির হাতে জিম্মি। শীতে কুয়াশা, বর্ষায় নদনদীতে উত্তাল ঢেউ ও স্রোত, গ্রীষ্মে ঝড়। স্থল-জল-আকাশ পথে গন্তব্যে পৌঁছানো দুঃসহ। একাধিকবার বর্ষায় স্টিমারে ঢাকা থেকে বরিশাল যাওয়া ও আসার সময় পদ্মা-মেঘনার সঙ্গমস্থলে ঢেউ ডেকের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে চলে যেতে দেখেছি। কী ভয়ঙ্কর মুহূর্ত ছিল তখন। প্রমত্ত পদ্মা নদী বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বরিশাল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর যে ‘দূরত্ব’ তৈরি করেছে, সেটা ঘুচিয়ে দিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। এ কাজে একটি বড় বাধা ছিল প্রকৃতির তরফে। সে বাধা জয় করায় প্রযুক্তিগত সম্পদ ও অর্থের প্রয়োজন ছিল। সে বাধার চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বব্যাংক। তারা ২০১২ সালের ২৯ জুন জানায় – ‘নিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে যে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র ঘটেছে।’ এ অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগের তীর কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের প্রতিও তাক করা ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা ছিলেন আপসহীন- বিশ্বব্যাংক কিংবা অন্য কারও অন্যায় দাবির কাছে নতিস্বীকার করার প্রশ্ন আসে না। এ অটল মনোভাবের জয় হয়েছে। বাংলাদেশ নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ যখন শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে স্বীকার করে নেন- পদ্মা সেতু প্রকল্পে কল্পিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রতিশ্র“ত ঋণ প্রত্যাহার করা ভুল পদক্ষেপ ছিল। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে তিক্ততা তৈরি হয়েছিল সেটা আর থাকবে না- এই ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক বাড়তি সহায়তা দেবে।’ বাস্তবে সেটাই ঘটেছিল।
পদ্মা সেতু চেতনার জয় এভাবেই হয়!
এ প্রসঙ্গে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান স্মরণ করতে পারি। স্বাধীনতার চার বছর পূর্ণ না হতেই তিনি ডাক দেন দ্বিতীয় বিপ্লবের- মূল লক্ষ্য উপনিবেশিক আমলের জঞ্জাল দুর্নীতি-অনিয়ম নির্মূল এবং স্বনির্ভরতা অর্জন। স্বনির্ভরতা যে কল্পিত নয়, আমাদের ভেতরেই এর রসদ রয়েছে, সেটা বলেন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে। জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের পর ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু সাধারণ পরিষদে ভাষণ প্রদানের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। নিউইয়র্কে বিশ্ব সভায় বাংলা ভাষায় বক্তব্য রাখার পর পরই যান ওয়াশিংটন, সে সময়ের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে আলোচনার জন্য। তার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং বিশ্বব্যাংকের দুই সিনিয়র অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশকে তাচ্ছিল্য করে বাস্কেট কেস হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তাদের বিবেচনায় ‘বাংলাদেশ যদি উন্নতি করতে পারে, তাহলে বিশ্বের যে কোনো দেশ উন্নতি করতে পারবে।’ এর সহজ ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে- এই ছেলে যদি এসএসসি পাস করে তাহলে কলাগাছও পাস করবে।
বঙ্গবন্ধু হেনরি কিসিঞ্জার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের বাংলাদেশ সম্পর্কে তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্যের মোক্ষম জবাব প্রদানের জন্য ওয়াশিংটনকেই বেছে নেন। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থে লিখেছেন- ‘ওয়াশিংটনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, কেউ কেউ বাংলাদেশকে International Basket Case বলে উপহাস করেন। কিন্তু বাংলাদেশ Basket Case নয়। দুইশ’ বছর ধরে বাংলাদেশকে লুট করা হয়েছে। বাংলাদেশের সম্পদেই শ্রীবৃদ্ধি করা হয়েছে লন্ডন, ডান্ডি, ম্যাঞ্চেস্টার, করাচি, ইসলামাবাদের।…. আজো বাংলাদেশে অফুরন্ত সম্পদ রয়েছে। একদিন আমরা দেখাবো বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।’
শেখ হাসিনা আমদের যে পদ্মা সেতু চেতনা উপহার দিয়েছেন, সেটা জাতির পিতার এ অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা। আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি।
আমরা নিশ্চয়ই এতে তৃপ্ত থাকব না। এ অর্জন নিঃসন্দেহে অনেক অনেক বড়, সন্দেহ নেই। সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে যেভাবে বড় বড় বাধা আমরা জয় করেছি, সেটা আমাদের প্রেরণা জোগাবে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন- বাংলাদেশের নেতৃত্ব, প্রশাসন এবং অন্য অনেক প্রতিষ্ঠান ‘অদক্ষ’। তাদের জন্য সর্বক্ষণ বাইরের ‘কনসালট্যান্ট’ প্রয়োজন। এ কনসালট্যান্টদের উচ্চ হারে বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় ঋণের বোঝা। সত্তরের দশকের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে একটি ঋণ দিয়েছিল ‘কৃষি ঋণের সুদের হার ৩৬ শতাংশ করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের’ জন্য। ঋণের প্রায় সব অর্থ ব্যয় হয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ‘কনসালট্যান্টদের’ সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য, যাদের কাজ ছিল কৃষকদের চরা সুদে ঋণ প্রদানের ফর্মুলা বের করা। আশুগঞ্জের একটি সার কারখানায় ‘দাতাদের ঋণ’ নিয়ে কাজের সময়েও দেখেছি- ‘কনস্যালট্যান্টরা’ যা চায়, তাই পায়। বিলাসী জীবন না হলে যে আমাদের উন্নতির সূত্র বের করতে পারেন না! একবার বিদেশী অর্থে পরিচালিত এক এনজিও ‘সুশীল- বস’ আমাকে বলেছিলেন- ‘দারিদ্র্য দূর করার চিন্তায় তিনি সব সময় অস্থও থাকেন। যখন কাজের চাপ বেশি পড়ে, তখন সুস্থ্য মস্তিষ্কে কাজ করার জন্য জন্য চলে যান রাজেন্দ্রপুরের ব্র্যাক সেন্টারে, যেখানে গ্রামীণ পরিবেশে মেলে ফাইভ স্টার হোটেলের সুবিধা।
শেখ হাসিনা উন্নত বিশ্ব ও তাদের নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে চ্যালেঞ্জ করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন, যা উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত অনেক দেশের নেতারা পারেন নাই। পদ্মা সেতু তাদেরও পথ দেখাবে।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল সেটা মিথ্যা প্রমাণ করেছে কানাডার আদালত। এর পেছনে বাংলাদেশের কোনো হাত ছিল না। কিন্তু যদি কানাডার আদালত এমন দ্ব্যর্থহীন রায় না দিত, তাহলে একটি মহল বলেই যেত- বাংলাদেশকে ঋণ দিও না, সে দেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করো না। কারণ সবকিছু লুটপাট হয়ে যাবে। কেউ কেউ শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগের দাবি করত। ঋণচুক্তি বাতিলের সময় (২৯ জুন, ২০১২) বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সরকারবিরোধী আন্দোলন ছিল তুঙ্গে। হরতাল-অবরোধ সফল করায় তাদের হাতিয়ার ছিল পেট্রল বোমা। ধর্মান্ধ চরমপন্থী গোষ্ঠীও ছিল মরীয়া। তারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে থাকে। পুলিশের ওপর হামলা চালায়। গৃহযুদ্ধের হুমকি দেয়। এমন সময়েই বিশ্বব্যাংকের ঢাকাস্থ আবাসিক প্রতিনিধি এলেন গোল্ডস্টেইন এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন- ‘ভবিষ্যতে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণ পেতে হলে শেখ হাসিনাকে অনেক অঙ্গীকার করতে হবে। ঋণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে এবং তা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে কী-না সে বিষয়েও প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিলের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার পেছনে বাংলাদেশের মানুষের ব্যপক সমর্থন রয়েছে।’
এটা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বসেই বিশ্ব্যাংকের এক কর্মকর্তার নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ। অভ্যন্ত্যরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের আরও ঘটনা আমরা পাই দৈনিক সমকালের ৩১ অক্টোবর, ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে- ‘বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা ভারত সফরে গিয়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও আগামী নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় অসন্তুষ্ট বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন- বিদেশী কূটনীকিদের বেশিরভাগই কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চললেও কেউ কেউ তা লঙ্ঘন করছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে ড্যান মজিনার সফরের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে আমাদের সঙ্গে কথা বলাই শিষ্টাচার। আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন নিয়ে বাইরে গিয়ে কথা বলাটা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন।’
নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যে স্বাধীনচেতা মনোভাব বঙ্গবন্ধু কন্যা দেখিয়েছেন সে জন্যই কি তাকে উচিত শিক্ষা দিতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের হুকুমে চলা বিশ্বব্যাংক? পদ্মা সেতু এখন বাস্তব। তবে উন্নত বিশ্বের সারিতে উঠে বসতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে এখনও লক্ষ্য পূরণে অনেক পথ দুস্তর পথ পাড়িতে দিতে হবে। তবে বড় ভরসা শেখ হাসিনার পদ্মা সেতু চেতনা। আমাদের জয় হবেই, যেমন হয়েছে একাত্তরে।
লেখক : ১৯৭৫ সালের ৭ জুন বঙ্গবন্ধু গঠিত জাতীয় ছাত্রলীগ কেন্দ্রয়ি কমিটির সদস্য, সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা।
সূত্র: বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের ওয়েবপেজ থেকে

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: