আজ: ২৪শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার, ১০ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১১ই জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি, ভোর ৫:১৬
সর্বশেষ সংবাদ
ধর্ম কথন মুসলিম বিবাহে সমতার ভিত্তি ও পদ্ধতি

মুসলিম বিবাহে সমতার ভিত্তি ও পদ্ধতি


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ১২/১২/২০২০ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: ধর্ম কথন


বিয়েতে সমতাবিধানকে আরবিতে ‘কুফু’ বলা হয়। ‘কুফু’র কোনো গুরুত্ব আছে কি? এ সম্পর্কে ইসলামের জবাব সুস্পষ্ট ও যুক্তিভিত্তিক। ‘কুফু’ মানে ‘সমতা ও সাদৃশ্য’। অন্য কথায়, বর ও কনের ‘সমান-সমান হওয়া’, একের সঙ্গে অন্যজনের সামঞ্জস্য হওয়া। বিয়ের উদ্দেশ্যে যখন স্বামী-স্ত্রীর মনের প্রশান্তি লাভ, উভয়ের মিলমিশ লাভের পথে বাধা বা অসুবিধা সৃষ্টির সামান্যতম কারণও না ঘটতে পারে, তার ব্যবস্থা করা একান্তই কর্তব্য।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই (আল্লাহ) মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পানি থেকে। অতঃপর তিনি তার বংশগত ও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তোমার রব সর্বশক্তিমান।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৫৪)

ইমাম বুখারি (রহ.) ‘বুখারি শরিফ’-এ এই আয়াতকে ‘কুফু’ অধ্যায়ের সূচনায় উল্লেখ করেছেন। আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) তার কারণ উল্লেখ করে লিখেছেন, এ আয়াতকে এখানে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে এ কথা জানিয়ে দেওয়া যে বংশ ও শ্বশুর-জামাতার সম্পর্ক এমন জিনিস, যার সঙ্গে ‘কুফু’র ব্যাপারটি সম্পর্কিত।

এ আয়াতে মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক ভাগ হচ্ছে বংশ রক্ষার বাহন। মানে পুরুষ ছেলে, বংশ তাদের দ্বারাই রক্ষা পায়, ‘অমুকের ছেলে অমুক’ বলে পরিচয় দেওয়া হয়। আর দ্বিতীয় ভাগ হচ্ছে বৈবাহিক সম্পর্ক রক্ষার বাহন। মানে কন্যাসন্তানকে অন্যের ঘরের ছেলের কাছে বিয়ে দিয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। আর এ বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে যাতে করে ভবিষ্যৎ বংশ রক্ষার ব্যবস্থা হয় সেই দৃষ্টিতে ‘কুফু’ রক্ষা করা একটা বিশেষ জরুরি বিষয়।

‘কুফু’র মানে যদিও সমান-সদৃশ, তবু বিয়ের ব্যাপারে কোন কোন দিক দিয়ে এর বিচার করা আবশ্যক, তা বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।

এ পর্যায়ে আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) লিখেছেন, ‘কুফু’ ইসলামী বিশেষজ্ঞদের কাছে সর্বসম্মত ও গৃহীত। তবে সেটি প্রধানত গণ্য হবে দ্বিন পালনের ব্যাপারে। কাজেই মুসলিম মেয়েকে কাফিরের কাছে বিয়ে দেওয়া যেতে পারে না।

ব্যভিচারী পুরুষ ঈমানদার মেয়ের জন্য এবং ব্যভিচারী নারী ঈমানদার পুরুষের জন্য কুফু নয়। কেননা স্বভাব-চরিত্র ও বাস্তব কাজের দিক থেকে এ দুই শ্রেণির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে, এই দুয়ের মধ্যে মনের মিল, চরিত্র ও স্বভাবের ঐক্য হওয়া, হৃদয়ের সম্পর্ক দৃঢ় হওয়া, নৈতিক চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং প্রাণের শান্তি ও স্বস্তি লাভ, যা বিয়ের প্রধান উদ্দেশ্য কখনো সম্ভব হবে না। তাই কোরআন মজিদের অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তবে যে ব্যক্তি মুমিন, সে কি পাপাচারীর মতো? তারা সমান নয়।’ (সুরা : সাজদা, আয়াত : ১৮)

অর্থাৎ মুমিন ও ফাসিক এক নয়, নেই এদের মধ্যে কোনো রকমের সমতা ও সাদৃশ্য। অতএব মুমিন স্ত্রী বা পুরুষ কখনোই ফাসিক বা কাফির স্ত্রী বা পুরুষের জন্য কুফু নয়।

কোরআনের উপরিউক্ত আয়াতদ্বয়ের সমর্থনে রাসুলে করিম (সা.)-এর নিম্নোক্ত বাণী উল্লেখযোগ্য। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যভিচারী তারই মতো দণ্ডপ্রাপ্তা ব্যভিচারিণী ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারে না।

উম্মে মাহজুল নাম্মী কোনো ব্যভিচারিণীকে বিয়ে করার অনুমতি প্রার্থনা করা হলে রাসুল (সা.) বলেন,

ব্যভিচারিণীকে ব্যভিচারী বা মুশরিক ছাড়া অন্য কেউ বিয়ে করবে না।

সুরা আন-নুরের নিম্নোক্ত আয়াতটিও এই পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচ্য। বলা হয়েছে, ‘দুশ্চরিত্রা মেয়েলোক দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য, দুশ্চরিত্র পুরুষরা দুশ্চরিত্রা মেয়েদের জন্য আর সচ্চরিত্রবতী মেয়েলোক সচ্চরিত্রবান পুরুষদের জন্য এবং সচ্চরিত্রবান পুরুষ সচ্চরিত্রা মেয়েদের জন্য।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২৬)

ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, চরিত্রহীনা মেয়ে চরিত্রহীন পুরুষদের জন্য, তাই চরিত্রহীনা মেয়েলোক চরিত্রবান পুরুষদের জন্য বিবাহযোগ্য হতে পারে না। কেননা তা কোরআনে বর্ণিত চূড়ান্ত কথার খেলাফ। অনুরূপভাবে সচ্চরিত্রবান পুরুষ সচ্চরিত্রবতী মেয়েদের জন্য। অতএব কোনো চরিত্রবান পুরুষই কোনো চরিত্রহীনা মেয়ের জন্য বিয়ের যোগ্য হতে পারে না। কেননা তাও কোরআনের বিশেষ ঘোষণার পরিপন্থী।

ইমাম শাওকানি (রহ.) লিখেছেন, দ্বিনদারি ও চরিত্রের দিক দিয়ে কুফু আছে কি না—বিয়ের সময়ে তা অবশ্যই লক্ষ করতে হবে। ইমাম মালিক (রহ) সম্পর্কে ইমাম শাওকানি (রহ.) লিখেছেন, ইমামা মলিক দৃঢ়তা সহকারে বলেছেন, কেবলমাত্র দ্বিনদারির দিক দিয়েই কুফু বিচার করতে হবে, অন্য কোনো দিক দিয়ে নয়।

আল্লামা খাত্তাবি (রহ.) সুনানে আবু দাউদের ব্যাখ্যায় ইমাম মালিকের নিম্নোক্ত কথাটি উদ্ধৃত করেছেন, কুফু কেবলমাত্র দ্বিনদারির দিক দিয়েই লক্ষণীয় ও বিবেচ্য। আর মুসলমানরা সবাই পরস্পরের জন্য কুফু।

এ ছাড়া ধন-সম্পদ ও বংশমর্যাদা ইত্যাদির দিক দিয়ে নারী-পুরুষের মধ্যে কুফুর কোনো প্রশ্নই নেই। শুধু ইমাম শাফিঈ (রহ) ধন-সম্পত্তির দৃষ্টিতেও ‘কুফু’র গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা এ কথা প্রমাণ করতে পারেনি যে ধনী ও গরিবের সন্তানের মধ্যে পারস্পরিক বিয়ে হলে দাম্পত্য জীবনে তাদের প্রেম ও ভালোবাসার সৃষ্টি হতে পারে না। তবে এক তরফের ধন-ঐশ্বর্য ও বিত্ত-সম্পদের প্রাচুর্য অনেক সময় দাম্পত্য জীবনে তিক্ততারও সৃষ্টি করতে পারে, তা অস্বীকার করা যায় না।

ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফিঈ (রহ.) একটি হাদিসের ভিত্তিতে বংশীয় ‘কুফু’র গুরুত্ব স্বীকার করেছেন।

ইমাম খাত্তাবি (রহ.) তাই লিখেছেন, বহুসংখ্যক মনীষীর মতে, চারটি কুফুর বিচার গণ্য হবে : দ্বিনদারি, স্বাধীনতা (আজাদি), বংশ ও শিল্প-জীবিকা। তাদের অনেকে আবার দোষত্রুটিমুক্ত ও আর্থিক সচ্ছলতার দিক দিয়েও কুফুর বিচার গণ্য করেছেন। ফলে কুফু বিচারের জন্য মোট দাঁড়াল ছয়টি গুণ।

হানাফি মাজহাবে কুফুর বিচারে বংশমর্যাদা ও আর্থিক অবস্থাও বিশেষভাবে গণ্য। এর কারণ এই যে বংশমর্যাদার দিক দিয়ে স্বামী-স্ত্রীতে পার্থক্য হলে যদিও একজন অন্যকে ন্যায়ত ঘৃণা করতে পারে না, কিন্তু একজন অন্যজনকে অন্তর দিয়ে গ্রহণ করতে অসমর্থ হতে পারে—তা অস্বীকার করা যায় না। অনুরূপভাবে একজন যদি হয় ধনীর দুলাল আর একজন গরিবের সন্তান, তাহলে যদিও সেখানে ঘৃণার কোনো কারণ থাকে না, কিন্তু একজন যে অন্যজনের কাছে যথেষ্ট আদরণীয় না-ও হতে পারে, তা কী করে অস্বীকার করা যেতে পারে? এসব বাস্তব কারণে দ্বিনদারি ও নৈতিক চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গে বংশমর্যাদা, জীবিকার উপায় ও আর্থিক অবস্থার বিচার হওয়াও অন্যায় কিছু নয়।

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: