আজ: ২১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার, ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি, সকাল ৬:৫১
সর্বশেষ সংবাদ
আইন ও বিচার, জাতীয়, মতামত প্রচলিত বিচার পদ্ধতিতে ধর্ষণ কমবে না

প্রচলিত বিচার পদ্ধতিতে ধর্ষণ কমবে না


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ১৩/১০/২০২০ , ৩:০৫ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: আইন ও বিচার,জাতীয়,মতামত


দেশজুড়ে একের পর এক ধর্ষণের খবর আসছে গণমাধ্যমে। ধরাও পড়ছে আসামিরা। যাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ, তাদের অনেকে সমাজের প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় প্রশ্রয় পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির আইন করা এবং দ্রুত বিচার শেষ করতে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণির পক্ষ থেকে তীব্র দাবি উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন সাজার পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হচ্ছে। মন্ত্রিসভা এ আইনের সংশোধনীর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে। এটি এখন অধ্যাদেশ আকারে জারির প্রস্তুতি চলছে। এ অধ্যাদেশ জারি হলে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবেন আদালত। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি যাবজ্জীবন সাজার যে বিধান করা হলো তাতে কি ধর্ষণ কমবে? উত্তরে বলব, এক কথায় তা বলা যাবে না। শুধু সাজা বাড়িয়ে সমাজ থেকে ধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধ দূর করা যাবে না। হয়তো কিছুটা কমবে। এ অপরাধ সমাজ থেকে দূর করতে হলে গোড়ায় যেতে হবে। সাজা বাড়ানোর পাশাপাশি যেসব সমস্যা আছে, তা দূর করতে হবে। সংস্কার আনতে হবে প্রচলিত বিচারব্যবস্থায়।

কোনো একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে প্রথমেই সঠিকভাবে এর তদন্ত করতে হবে। সঠিকভাবে তদন্ত করতে গেলে এখন যেসব তদন্ত কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে, তা থেকে বের হতে হবে। কারণ খোঁজ নিলে দেখা যাবে, একেকজন পুলিশ কর্মকর্তার ওপর কত মামলা তদন্তের দায়িত্ব রয়েছে। একসঙ্গে অনেক মামলা তদন্তের দায়িত্ব থাকায় এই বিশেষ মামলার তদন্তে যথাযথ মনোযোগ দিতে পারেন না তাঁরা। ফলে তদন্তে ত্রুটি থেকে যায়। ধর্ষণের মতো অপরাধের তদন্তে পেইন স্টেকিং ইনভেস্টিগেশনের প্রয়োজন হয়। এটা করতে গেলে যথেষ্ট লোকবলের প্রয়োজন। এ কারণে ধর্ষণের মামলা তদন্তে পৃথক তদন্ত টিম বা সংস্থা করতে হবে। আমেরিকার এসপিআই বা ইংল্যান্ডের নিউ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মতো দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে তাদের। প্রয়োজনে এ সংস্থার সদস্যদের বিদেশে নিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অভিযোগপত্র যাতে ঢিলা না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। তদন্ত সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তা মনিটর করতে হবে।

এরপর রয়েছে বিচারপ্রক্রিয়া। মামলাটি আদালতে যাওয়ার পর যাঁরা বিচারের অংশ তাঁদের সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমেই দায়িত্ব আসে প্রসিকিউশনের ওপর। দক্ষ ও জ্ঞানী সিনিয়র আইনজীবীদের প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। তাঁদের বেতন-ভাতাও যথেষ্ট পরিমাণ হতে হবে। তা না হলে একজন প্রসিকিউটর সংসার চালাতে সরকারি মামলার বাইরে বেশি বেশি প্রাইভেট মামলা নেবেন। আর সরকারি মামলা তাড়াহুড়া করে বিচার সম্পন্ন করতে যা করার তাই করবেন। এতে দেখা যায়, মামলায় ঠিকমতো সাক্ষ্য নেওয়া হয় না। মামলার বিচার বিলম্বিত হয়। ফলে বিচারটাও সঠিক হয় না। আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাক্ষীরা ভয়ে আসে না। এলেও সঠিক সাক্ষ্য দেয় না। সে জন্য সাক্ষীদের সুরক্ষা আইন করতে হবে। আর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে যে পরিমাণ মামলার চাপ, তাতে বিচারকরাও ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারেন না। তাঁদের অধিক হারে মামলা নিষ্পত্তি দেখাতে গিয়ে তাড়াহুড়া করতে হয়। এই সুযোগে আসামিরা খালাস পেয়ে যায়।

দেশে বর্তমানে ৩৫ লাখের বেশি মামলার জট রয়েছে। এ জট দূর করতে হলে ও ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার করতে হলে বিচারক সংকট দূর করতে হবে। দেশে ছয়-সাত হাজার বিচারক নিয়োগ দিতে হবে। এ মুহূর্তে এটা হয়তো রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু প্রতিবছর ৫০০-৬০০ করে বিচারক নিয়োগ দেওয়া গেলে ধীরে ধীরে দক্ষ বিচারক গড়ে উঠবে। তত দিন অবসরপ্রাপ্ত দক্ষ ও সৎ বিচারকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হবে ধর্ষণ মামলার বিচারের জন্য। এটা করা গেলে বিচার বিলম্বিত হওয়া বা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া যাবে। বিচার তাড়াতাড়ি শেষ হলে অপরাধীরা শাস্তি পাবে। তখন অপরাধপ্রবণতা কমবে। এখন বিচার বিলম্বিত হওয়ায় জামিনে বেরিয়ে আসামিরা নতুন করে অপরাধে জড়ায়। দ্রুত বিচার হলে অপরাধীরা সজাগ হবে।

এসবের বাইরে সরকারকে আরেকটি বড় কাজ করতে হবে। তা হলো আসামিপক্ষের প্রায় সব আইনজীবীই ধর্ষিতাকে দুশ্চরিত্রা প্রমাণ করতে প্রাণপণ চেষ্টা চালান। তখন ধর্ষিতাকে আদালতে তার ধর্ষণের বর্ণনা দিতে হয়। এখানে ধর্ষিতা আরেকবার ‘ধর্ষণের শিকার’ হয়। বিচারক, আইনজীবী শত শত মানুষের সামনে এমন ঘটনা ঘটান যে কোনো কোনো ভিকটিম আদালতে আসেই না। এ কারণে বর্তমান সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ নম্বর ধারার ৪ নম্বর উপধারা বাদ দিতে হবে। এটা করা গেলে ধর্ষিতাকে ‘দ্বিতীয়বার ধর্ষণের’ হাত থেকে রক্ষা করা যাবে।

এত কিছুর পরও যদি দ্রুত বিচার না হয়, তাহলে এত সংস্কার করে লাভ কী? তাই দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে হলে একটি মামলায় বিচার শুরুর পর থেকে বিরতিহীনভাবে একটানা মামলার বিচারকাজ পরিচালনা করতে হবে। ওই মামলার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত মামলা মুলতবি করা যাবে না। এটা করা গেলে কাজের কাজ হবে। ধর্ষকরা সতর্ক হবে। সমাজ থেকে অপরাধ কমবে।

লেখক : সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান।

Comments

comments

Close