আজ: ২০শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার, ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩রা রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি, রাত ১২:০৯
সর্বশেষ সংবাদ
জাতীয়, মতামত গণতন্ত্র আর উন্নয়নের মশাল নিভতে দেওয়া চলবে না

গণতন্ত্র আর উন্নয়নের মশাল নিভতে দেওয়া চলবে না


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ১২/১০/২০২০ , ৩:৩২ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: জাতীয়,মতামত


ভারতের নতুন হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামীর সক্রিয়তা সম্পর্কে ভারতীয় এক পাঠক অনুত্তম সেন আমার গত সপ্তাহের লেখা পড়ে ফেসবুকে মন্তব্য করেছেন যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে এত অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তা একজন কূটনীতিকের পক্ষে মেটানো অসম্ভব। আবার বাংলাদেশবান্ধব এক প্রবীণ বাঙালি সাংবাদিক বলেছেন যে তিস্তা চুক্তি এবার ভারতকেই করতে হবে। নিদেনপক্ষে এই চুক্তি না করা পর্যন্ত এ সম্পর্ক আবার আগের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় ফিরে যেতে পারে না। আমি অনুত্তম সেনকে বললাম, হবে না, হচ্ছে না, সেই আগের সম্পর্ক নেই—এসব কথা বলে একজন কূটনীতিক যদি ঢাকায় গিয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকেন, ইলিশ মাছ খান, চট্টগ্রাম বেড়াতে যান আর আড়ংয়ে গিয়ে শাড়ি ও নতুন নতুন ডিজাইনের কুর্তা কিনে তাঁর কার্যকালটা পার করে দেন, তাহলে সেটাই কি উচিত কাজ হবে? কূটনীতিকের কাজই তো হচ্ছে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে ইতিবাচক আবহকে বাঁচিয়ে রাখা। নতুন করে সে আবহ তৈরি করা। আমি নিজে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ছাত্র ছিলাম। আমার একটা অসাধারণ টেক্সট বই ছিল, জোসেফ ফ্রাংকেলের ‘ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস’। ফ্রাংকেল ইংল্যান্ডে সাউথাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির অধ্যাপক ছিলেন। তিনি তাঁর এই বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে একেবারে প্রাককথনেই বলেছিলেন, একটি রাষ্ট্রের চাহিদা ও তার বাস্তবায়নের মধ্যে সব সময়ই ব্যবধান থাকে। বিদেশনীতিতে এ হলো desire এবং actualisation of desire বা প্রত্যাশা পূরণের দূরত্ব। এই ইচ্ছাকে ইচ্ছা পূরণে নিয়ে যাওয়ার কাজটাই হলো কূটনীতিকের কাজ।

বিক্রম দোরাইস্বামী তো ঠিক সেই কাজটাই করছেন। এবার দায়িত্ব নিয়ে তাঁর ঢাকা যাওয়ার আগে প্রতিটি পদক্ষেপ খুবই পূর্বনির্ধারিত। যেমন—তিনি এবার ঢাকায় কিভাবে গেলেন? দিল্লি থেকে আগরতলা, সেখান থেকে ঢাকা। আগরতলা থেকে তিনি বাংলাদেশে এলেন হেঁটে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৯৯২ ব্যাচের কর্মকর্তা এত দিন অতিরিক্ত সচিব হিসেবে আন্তর্জাতিক সংগঠন ও সম্মেলন বিভাগের ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এখানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্য, যাকে সাত ভাই ও এক বোন বলা হয়, তার মধ্যে ত্রিপুরার মতো ছোট্ট রাজ্যটি এখন ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল কংগ্রেস সে রাজ্যে শাসকদল। বিজেপির সঙ্গে এখন তাঁর চলছে সম্মুখসমর। সামনের মে মাসে রাজ্যে ভোট। তা ছাড়া তিস্তা চুক্তি রূপায়ণে এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেসই হয়েছিল প্রধান বাধা। এ অবস্থায় ত্রিপুরা হতে পারে ছোট রাজ্য, তার লোকসভা সদস্য মাত্র দুজন; কিন্তু এখানে এখন শাসকদল বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব নবীন, নরেন্দ্র মোদির অনুগত ও অতি সক্রিয়। আগরতলার সঙ্গে বাংলাদেশের রেলপথ যোগাযোগ তো আছেই, এ ছাড়া বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজও এগোচ্ছে। ৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ প্রকল্প, আগরতলা থেকে বিদ্যুৎ যাবে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের ভেড়ামারা-বহরমপুর যোগাযোগ স্থাপন। আখউড়া থেকে আগরতলা রেল যোগাযোগ। কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল প্রকল্প।

আসলে একটা দেশের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কে রাষ্ট্রপ্রধানদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়ন বিশেষভাবে কাজ করে। নরেন্দ্র মোদি এই ব্যক্তিগত সম্পর্ক রচনার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে মনোনিবেশী। তা সে জাপান, চীন, আমেরিকা, রাশিয়া সব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের ক্ষেত্রে। শেখ হাসিনারও রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্য দারুণ। আমার মনে হয়, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে তিনি নিজে খুব ছোটবেলা থেকে পৃথিবীর নানা প্রান্তের বিশিষ্ট মানুষজনকে দেখেছেন, ফলে কূটনৈতিক শিষ্টাচার তাঁর ডিএনএতেই ছিল। শেখ হাসিনা দেখেছেন জেলে বাবাকে কিভাবে মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। সেনানিবাসে মাথার ওপর সারাক্ষণ ৫০০ পাওয়ারের বাল্ব জ্বালিয়ে রাখা, ঘুমিয়ে পড়লেই ডেকে তুলে খাবার দিয়ে তাতে তেলাপোকা ছেড়ে দেওয়া। এহেন বঙ্গবন্ধুর কন্যাও তাই জানেন ভারতের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সম্পর্ক কিভাবে রক্ষা করতে হয়। কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। মোদি নিজেও বলেছেন, কখনো কাঠমাণ্ডু, কখনো শান্তিনিকেতন, কখনো ঢাকা শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর বারবার বৈঠক হয়েছে, তাতে পরস্পর পরস্পরের রসায়নটাও অনেকটাই বুঝতে পেরেছেন।

সত্যি কথা বলতে কী, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কটি কংগ্রেস ও আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সম্পর্কের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা আজ আর চলবে না। বরং মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বারবার এই বার্তাই দিয়েছেন যে দুই দেশের সম্পর্কে কখনোই তিনি চিড় ধরতে দেবেন না। এ কথা সত্য, কিছু গোঁড়া বিজেপি এখনো বলেন ও লেখেন যে বঙ্গবন্ধু দেশভাগের সমর্থক ছিলেন, এমনকি আজকের পশ্চিম বাংলাকেও তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অঙ্গ হিসেবে চেয়েছিলেন। তা ছাড়া অনুপ্রবেশ থেকে নাগরিকত্ব বিল নানা বিষয়ে বিজেপি প্রকাশ্যে বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান নিয়েছে; কিন্তু শেষ কথা বলেছেন মোদি। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন অনুপ্রবেশ বা নাগরিকত্ব বিল এখনই কার্যকর করা হবে না।

ঠিক এ রকম এক পটভূমিতে তাই বিক্রম দোরাইস্বামীর কূটনৈতিক আবির্ভাবে যথেষ্ট Symbolism আছে। তিনি ঢাকায় প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছেন যে কভিড মহামারির আগে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে গতি ছিল, তিনি সেটাই ফিরিয়ে আনতে চান। একই সঙ্গে প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন, কানেক্টিভিটি জোরদারে তিনি অগ্রাধিকার জানিয়েছেন। বাংলাদেশে আরো ভারতীয় ব্যবসা তিনি আনতে চান। ভারতীয় ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল বাংলাদেশে করার কথা হচ্ছে। বাংলাদেশ আগ্রহী হলে সেই ভ্যাকসিন উৎপাদন ও সরবরাহ বিষয়ে দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগ আছে। বিক্রম আরো বলেছেন, ভারত-বাংলাদেশ সব সময় বিশেষ বিশেষ অংশীদার ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এই অংশীদারিরও ঊর্ধ্বে। কারণ এই অংশীদারির এক সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে, যা যৌথ ত্যাগ ও লড়াইয়ের।

বিক্রম ঢাকা পৌঁছে প্রথমে বঙ্গবন্ধুকে নীরবে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। করোনাভাইরাসের জন্য আকাশপথে স্বাভাবিক যোগাযোগ বন্ধ। তাই তিনি আগরতলা-আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে যান ধানমণ্ডিতে। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ঢাকার বারিধারায় ভারতীয় হাইকমিশনে যান। ৮ অক্টোবর তিনি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয়পত্র পেশ করেন।

আগামী বছর ৫০তম স্বাধীনতাবার্ষিকীর দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। দুই দেশের মধ্যে এক ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণের পর্ব শুরু হয়েছে। এই সময়ে বিক্রমের দায়িত্বভার গ্রহণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিক্রম গুলশানে ইন্ডিয়া হাউসে প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই বলেছেন, আজ গোটা বিশ্ব বাংলাদেশকে শ্রদ্ধার চোখে দেখছে, তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সাফল্য দেখে।

তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে সামরিক অভ্যুত্থান ও গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রসঙ্গে যুগপৎ শুনেছি আমরা। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার সদ্যঃস্বাধীনতা পাওয়া দেশগুলোতে ঋণজর্জর অনুন্নত অর্থনীতি, জনগণের নিরক্ষরতা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের অনুপস্থিতি, সামরিক বাহিনীর ঔপনিবেশিকতা, উচ্চাভিলাষী জেনারেলদের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা। এসবের মধ্যে বাংলাদেশ আর্থিক উন্নয়নমুখী ধর্মনিরপেক্ষ পথে হাঁটছে—এ কম কথা নয়।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে ধর্মান্ধ পাকিস্তানি শাসকদের কবল থেকে বাঙালিদের উদ্ধার করে বাঙালি জাতীয়তাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক রাষ্ট্র গঠন করেন। সেই বিরামহীন সংগ্রাম ও বহু নির্যাতনের ইতিহাসের গৌরবগাথা নিয়ে এগোচ্ছেন শেখ হাসিনা। ভারত সহযোদ্ধা। গণতন্ত্র আর উন্নয়নের এই মশাল নিভতে দেওয়া চলবে না।

Comments

comments

Close