আজ: ১৮ই অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার, ২রা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১লা রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি, সকাল ৯:৪৯
সর্বশেষ সংবাদ
জাতীয়, বিশেষ প্রতিবেদন নারীর প্রতি বর্বরতা রুখে দাঁড়াও

নারীর প্রতি বর্বরতা রুখে দাঁড়াও


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ০৬/১০/২০২০ , ২:১৭ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: জাতীয়,বিশেষ প্রতিবেদন


নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে বর্বরোচিত নির্যাতনের প্রতিবাদে গতকাল সোমবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে। ধর্ষণবিরোধী গণজমায়েতে উত্তাল ছিল রাজধানীর শাহবাগ। উত্তরায় প্রায় এক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রেখেছে শিক্ষার্থীরা। এসব সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে শুধু নোয়াখালীর ওই ঘটনা নয়, সিলেটের এমসি কলেজে সংঘবদ্ধ ধর্ষণসহ সারা দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানিয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হয়েছে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আজ মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো অব্যাহত রয়েছে।

রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রতিবাদী পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড হাতে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেয়। কোনো পোস্টারে লেখা ছিল ‘ ছি! রাষ্ট্র’, আবার কারো কারো হাতে ছিল ‘রুখে দাঁড়াও আমার বোন, ধর্ষণের বিচার চাই’ লেখা পোস্টার।

দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে শাহবাগ চার রাস্তার মোড়ে গতকাল সকাল থেকেই অবস্থান নিতে শুরু করে ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠন ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। দুপুর ১২টা থেকে অবস্থান কর্মসূচি উত্তাল হতে শুরু করে। পাশাপাশি জাতীয় জাদুঘরের সামনে ও শাহবাগ মোড় অবরোধ করে স্লোগান দেয় আন্দোলনকারীরা। ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিছিলসহকারে বিক্ষুব্ধ জনতা দলে দলে এসে তাতে যোগ দেয়। ধর্ষণবিরোধী স্লোগান দেয়। অবরোধকারীরা ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানায়।

অবস্থানের প্রথম দিকে শাহবাগ এলাকায় যান চলাচল বন্ধ থাকায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে কিছু সময় পর ধীরগতিতে যান চলাচল করতে দেয় বিক্ষোভকারীরা। পুলিশ বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বাধা দেয়নি।

অবস্থান কর্মসূচির সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন ছাত্র ইউনিয়ন এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে ‘শাহবাগ প্ল্যাটফর্মের’ নেতাকর্মীরা। দুপুরে বামপন্থী কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মী এবং ‘সম্মিলিত ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে অনেকে উপস্থিত ছিলেন। এই গণজমায়েত থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পলি কর্মকার বলেন, ‘নারীর সম্মান নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলা চলতে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে ধর্ষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছি। ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক দিলারা জামান বলেন, ‘ধর্ষণের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে এখানে এসেছি। গত দুই মাসে সারা দেশে কমপক্ষে ১৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর একটি ঘটনায়ও বিচার না হওয়ায় একের পর এক ঘটনা ঘটছে।’

অবস্থান কর্মসূচিতে সমর্থন জানিয়ে অংশগ্রহণ করেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকীসহ অন্য নেতারা। একই দাবিতে মানববন্ধন করে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন সংগঠন ছাত্র অধিকার পরিষদ, নিরাপদ নোয়াখালী চাই নামের একটি সংগঠন ও ছাত্রদল।

সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত উত্তরা হাউস বিল্ডিং এলাকায় প্রায় এক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। এতে অংশ নেয় উত্তরা ও রাজউক হাই স্কুলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তারা ধর্ষকদের ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দেয়।

ঢাকার বাইরে নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গতকাল সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে। এসব কর্মসূচি থেকে অবিলম্বে সব নির্যাতনকারীর ফাঁসির দাবি জানানো হয়।

এ ছাড়া ঘটনাস্থল এখলাসপুরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ যৌথভাবে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে।

ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে চট্টগ্রামে আয়োজিত প্রতিবাদসভা থেকে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়।

গতকাল বিকেলে নগরের চেরাগী পাহাড় মোড়ে ‘সর্বস্তরের সচেতন নাগরিকবৃন্দ’র ব্যনারে আয়োজিত এই সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনার বিচার না হওয়ায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এ কারণে একের পর এক বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে চলেছে। অবিলম্বে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ধর্ষক ও নিপীড়কদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এ অপরাধপ্রবণতা থামবে না। দেশের নারীসমাজকে সুরক্ষিত করতে হলে অবিলম্বে বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে।

‘শুধু গ্রেপ্তার নয়, দ্রুত বিচার নিশ্চিত কর’ স্লোগানে আয়োজিত সমাবেশ থেকে ধর্ষকদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে তাদের বিচার ও সামাজিকভাবে বয়কট করার দাবি জানানো হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে জেলা কওমি মাদরাসার সাবেক ছাত্র ও সচেতন যুবকবৃন্দ। প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন মুহাম্মদ ইউসুফ ভূইয়া। বক্তব্য দেন হাফেজ মাওলানা আবু ইউসুফ ভূঁইয়া, কওমি প্রজন্ম ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক হাফেজ মাওলানা জুনায়েদ কাশেমী, ভাদুঘর মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ, আসাদুল ইসলাম, সোহেল মাহমুদ, ইসহাক আল-মামুন প্রমুখ।

গাইবান্ধায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ও বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে রেলগেট এলাকায় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

ঝালকাঠি প্রেস ক্লাবের সামনে ৭১-এর চেতনা নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মানববন্ধনের আয়োজন করে। কর্মসূচি থেকে বেগমগঞ্জে নারী নির্যাতন এবং পরে তা ভিডিও করে ফেসবুকে ভাইরাল করার তীব্র নিন্দা জানানো হয়। এই ঘটনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণকারীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।

ফরিদপুরে জেলা সিপিবির উদ্যোগে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১১টার দিকে শহরের নিলটুলী এলাকার প্রেস ক্লাবের সামনের মুজিব সড়কে আধাঘণ্টার এই মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন জেলা মহিলা পরিষদের সম্পাদক হোসনেআরা খানম, জেলা সিপিবির সম্পাদক অরুণ কুমার শীল, বেলায়েত হোসেন প্রমুখ।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরামের আয়োজনে গতকাল সকাল ১১টায় রাজধানীর শ্যামলীতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। একই সময়ে নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, ফরিদপুর, নওগাঁ, বাগেরহাট, নীলফামারী, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, মেহেরপুর, যশোর, নেত্রকোনা, নরসিংদী, নাটোরসহ বাংলাদেশের ২৪টি জেলায় ২৭টি স্থানীয় সহযোগী সংস্থার অংশগ্রহণে ধর্ষণের ক্রমবর্ধমান ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে তাঁর ওপর বর্বর নির্যাতনের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। এই ঘটনাকে বর্বরোচিত নারী নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে আসক। একই সঙ্গে এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুততার সঙ্গে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ নির্যাতিত নারী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা ও মানসিক সেবা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়। গতকাল আসকের পক্ষ থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব জানানো হয়।

একই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি। কমিটির পক্ষে মহিলা সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন স্থানীয় প্রতিনিধিরা]

Comments

comments

Close