আজ: ১৭ই অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার, ১লা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩০শে সফর, ১৪৪২ হিজরি, বিকাল ৫:৫২
সর্বশেষ সংবাদ
জাতীয়, বিশেষ প্রতিবেদন, মতামত, রাজনীতি ই-জিপি ব্যবস্থাপনা অকার্যকর করে দেওয়া উদ্বেগজনক

ই-জিপি ব্যবস্থাপনা অকার্যকর করে দেওয়া উদ্বেগজনক


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ৩০/০৯/২০২০ , ৩:০৭ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: জাতীয়,বিশেষ প্রতিবেদন,মতামত,রাজনীতি


সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে বলেছে, ই-জিপি (ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) চালু করার পরও সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। এটা খুব হতাশাজনক। আসলে সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, আলোচনা হয়েছে; কিন্তু তা দূর করা যায়নি। এটা বন্ধ করতে ই-জিপি ছাড়াও বিভিন্ন সরকার আরো অনেক উদ্যোগ নিয়েছে, নানা রুল-রেগুলেশন তৈরি করেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠা করেছে, এর ক্ষমতা বাড়িয়েছে, একে স্বাধীন সংস্থায় রূপ দিয়েছে, সংস্থাটা নিজেও অনেক চেষ্টা করছে; কিন্তু কিছুতেই দুর্নীতির লাগাম টানা যাচ্ছে না, বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। আগে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় বেশি দুর্নীতি হতো, এখন তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে এবং বড় আকারে হচ্ছে। দুর্নীতির শাখা-প্রশাখার যেন অন্ত নেই। এসব কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না, তা আমাদের কমবেশি সবার জানা। টিআইবির রিপোর্টেও তা সুস্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে। এখন কারণগুলো জানা সত্ত্বেও কেন সেটা বন্ধ করা যাচ্ছে না, তা নাগরিকদের উদ্বেগের বিষয়।

আমাদের দেশে যে দুর্নীতি হয়, তার বড় অংশই হয় সরকারি কেনাকাটার (গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) মাধ্যমে। প্রকিউরমেন্ট বলতে বোঝায় সরকারি কাজ এবং সামগ্রী সরবরাহ। টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ই-জিপি করা হলেও ঠিকাদারদের কার্যাদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ, সিন্ডিকেট এখনো কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতার অভাব খুবই উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি বহুল প্রত্যাশিত ও কার্যকর ব্যবস্থা যখন অকার্যকর করে দেওয়া হয়, তখন তা উদ্বেগজনক হওয়ারই কথা।

দেশে আগে কতগুলো ট্র্যাডিশন ছিল। পিডাব্লিউডি, রোডস অ্যান্ড হাইওয়েসহ সরকারের কিছু নির্দিষ্ট বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটায় দুর্নীতি হতো। এখন সব জায়গায় দুর্নীতি হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। আমি চাকরিজীবনেও স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি দেখেছি। এ ব্যাপারে আমার কিছু রিপোর্টও তখনো দিয়েছিলাম। যত দিন যাচ্ছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি তত বেড়ে চলেছে। এখন তো ড্রাইভাররাও সাততলা, দশতলা বাড়ি করে। এখানে অন্তহীন দুর্নীতি হচ্ছে। এ খাতের দুর্নীতি নিয়ে আগে এত আলোচনা হয়নি। এখানে টপ টু বটম বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান চালানো দরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের লোকজন করোনা মোকাবেলায় ভালো কাজ করছে। সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি উৎসাহ দেওয়ার জন্য বলেছেন। যারা পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য, তারা পুরস্কৃত হবেই। কিন্তু যাদের কাজে ব্যর্থতা আছে, বিশেষ করে করোনাসংক্রান্ত ব্যর্থতা, সে জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থাও জরুরি। বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে এই ব্যর্থতাগুলোর ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছেন। আমি বলতে চাচ্ছি, পুরস্কারের পাশাপাশি অযোগ্য ও অনিয়মকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে দুর্নীতি বন্ধ হবে না।

করোনাকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির বড় বড় ঘটনা ঘটতে দেখা গেল। যেমন—সাহেদের দুর্নীতি, সাবরিনার দুর্নীতি। এর মধ্যে ড্রাইভার মালেক যোগ হয়েছে। তার আগে আবজাল। এখন এই খাতটা একটা দুর্নীতির ঘাঁটি হয়ে গেছে। কেন এমন হলো, তা ভালোমতো তদন্ত হওয়া দরকার, এমনটাই সবাই বলবেন। তবে একটা-দুইটা অভিযানে যে কাজ হয় না সেটাও এরই মধ্যে জানা হয়ে গেছে। বড় সমস্যা হচ্ছে, যারা শুধু ধরা পড়ছে, তাদের নিয়েই আমরা কয়েক দিন হৈচৈ করি। তারপর আবার নতুন করে আরেকটা কেউ বের হয়, আবার সেটা নিয়ে ঝড় হয়। এ রকমই চলছে। তাই আলোচিত ঘটনার দিকে শুধু নজর না দিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে অন্য দুর্নীতিবাজদেরও খুঁজে বের করতে হবে। কেউ যখন দুর্নীতি করে আড়ালে থেকে যায়, তখন তাকে দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হয়। এ জন্য ছোট-বড় সবার বিরুদ্ধেই অভিযানটা চালাতে হবে।

ই-জিপি বলতে গেলে অকার্যকর করে দেওয়া হলো। টিআইবির রিপোর্টে বলা হলো, রাজনৈতিকভাবে কাজের নিয়ন্ত্রণ ও ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নাকি স্থানীয় সংসদ সদস্যরাও তা ঠিক করে দেন। আবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজে না করে অনেক ক্ষেত্রে কম্পিউটার অপারেটর দিয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেন। এতে গোপনে ঠিকাদারদের মধ্যে সর্বনিম্ন দর জানিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এই প্রতিবেদনে কেনাকাটায় রাজনীতিকদের প্রভাব খাটানো এবং কর্মকর্তাদের পেশাদারির অভাব স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। কাজের মনোপলির বিষয়টাও উঠে এসেছে। একেক জায়গায় একেক ব্যক্তি বা চক্রের কাজ বাগিয়ে নেওয়ার যে চেষ্টা, সেটা বন্ধের পদক্ষেপ নিতে হবে। তাই কেনাকাটায় অনিয়মের জন্য রাজনৈতিক প্রভাব, কর্মকর্তাদের ভয় ও লোভের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারার পাশাপাশি মনোপলি ব্যবস্থাও অকার্যকর করে দিতে হবে।

বোঝা যাচ্ছে, দুর্নীতির পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব বা হস্তক্ষেপ এখনো বড় কারণ। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা আনা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিটি দলের স্থানীয় শাখাগুলোর কার্যক্রমে নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনীতি করলে ভালো ব্যবসা করা যায়—এই প্রবণতাও অনতিবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। এ জন্য একটা বক্তৃতা বা দলীয় আদেশ জারিই যথেষ্ট নয়। এ জন্য দলগুলোকে ভেতর থেকে সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে দলে নতুন লোক নিতে হবে বুঝে-শুনে। এখন পার্লামেন্টে ৬২ শতাংশ ব্যবসায়ী। এতে কোনো দোষ নেই এবং তাঁদের অধিকার আছে সংসদ সদস্য হওয়ার। কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগ রাজনীতি করছেন ব্যবসার জন্য। তাহলে দুর্নীতি কমবে কিভাবে? সরকারি কাজে তাঁদের অনৈতিক প্রভাব কমিয়ে আনা কঠিন। তাই এখন একটাই উপায়, তা হচ্ছে দলগুলোকে তাদের আদর্শ অনুযায়ী চলতে হবে, তাদের যে প্রকৃত কাজ রাজনীতি, দেশ শাসন, মানুষের পক্ষে কাজ করা, ক্ষমতায় আসা-যাওয়ার পথ স্বচ্ছ রাখা, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা—এসব কাজেই তাদের থাকতে হবে। বাস্তবে তা হচ্ছে না বলেই দুর্নীতির সুযোগ আরো বেড়ে গেছে।

দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারার আরেকটা কারণ বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। দুর্নীতি দমন কমিশন বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো চেষ্টা করে। আবার বিচারের প্রক্রিয়া অনেক লম্বা। এই লম্বা প্রক্রিয়ায় শাস্তি দেওয়াটা কঠিন। ফলে হয় কি, দুর্নীতিবাজরা আশকারা পেয়ে যায়। এই যে শেষ পর্যন্ত কিছু হবে না—এটাই দুর্নীতিবাজদের ভরসা হয়ে ওঠে। আমরা তো বড় কোনো দুর্নীতিবাজের শাস্তি হয়েছে বলে দেখিনি। কারো ২০ থেকে ২৫ বছরের জেল হয়েছে বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে বলে শুনছি না। এ রকম শাস্তির ঘটনা খুঁজলে পাওয়া যাবে না। আর রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে শাস্তির নজির প্রায় পাওয়াই যায় না।

দুর্নীতি বন্ধ করতে বড় বিষয় হচ্ছে, এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ‘জিরো টলারেন্স’, যেটা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে থাকেন। এই জিরো টলারেন্সটা দেখাতে হবে। যাদের কারণে জিরো টলারেন্স ব্যাহত হচ্ছে, তাদের ছাড় দেওয়া চলবে না। এ জন্য সবচেয়ে বড় কথা হলো রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সাম্প্রতিককালে যেসব বড় দুর্নীতি হচ্ছে, সেসব ঘটনায় কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তাই রাজনীতিবিদদেরই দুর্নীতি দমনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখতে হবে।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

Comments

comments