আজ: ১৩ই জুলাই, ২০২০ ইং, সোমবার, ২৯শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২২শে জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী, সন্ধ্যা ৭:৩০
সর্বশেষ সংবাদ
ফেসবুক থেকে করোনা পরিস্থিতি: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিকিৎসকের খোলা চিঠি

করোনা পরিস্থিতি: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিকিৎসকের খোলা চিঠি


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ১৯/০৩/২০২০ , ৭:৪০ অপরাহ্ণ | বিভাগ: ফেসবুক থেকে


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
একটি বৈশ্বিক মহামারী চলতে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী একজন বাঙালি হিসেবে কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আপনার সদয় বিবেচনা এবং জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি। নিচের ছবিটি দেখলে লক্ষ্য করবেন উল্লেখিত দেশগুলো উচ্চ আয়ের রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও কোভিড-১৯ এর মহামারী ঠেকাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার মূল কারণ, ঐ দেশগুলোর নীতি নির্ধারকগনের প্রকৃত পরিস্থিতি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়া এবং সময়ের কাজ সময়ে না করা। উল্লেখিত প্রতিটি দেশেই কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ শুরু হয়েছিল চীন বা অন্য দেশে থেকে দুই একজন ব্যক্তির মাধ্যমে। প্রথম ২-৩ সপ্তাহ হাতে গোনা কয়েকজনের দেহে SARS-CoV-2 ভাইরাস পাওয়া গেলেও, একটা পর্যায়ে সেই সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ, প্রথমে দেশে প্রবেশ করা সেই দুই-একজন ব্যক্তি তাদের পরিবার থেকে শুরু করে যত মানুষের সংস্পর্শে গিয়েছেন, তাদের অনেকের দেহেই SARS-CoV-2 ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে। এই ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণগুলো প্রকাশ হতে সাধারণত ১-২ সপ্তাহ সময় প্রয়োজন হয় এবং সাধারণ সর্দি কাশির সাথে মিল থাকায় পরীক্ষা না করে শুধু শারীরিক লক্ষণ দেখে এটি আলাদা করা সম্ভব হয় না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর প্রথম রোগী সনাক্ত করা হয় গত ০৮ মার্চ, বর্তমানে সেই সংখ্যা ১৭ জন, যাদের মধ্যে মারা গিয়েছেন ১ জন। অন্যদিকে গত দুই মাসে লাখ লাখ মানুষ সড়ক ও আকাশ পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, যাদের অনেকেই কোভিড-১৯ এর মহামারী চলছে, এমন দেশ থেকে আগত। আমরা প্রথম থেকেই অধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশসমূহ থেকে আগত যাত্রীদের বাধ্যতামূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোয়ারাইন্টাইন করার দাবি জানিয়ে আসছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও নীতিনর্ধারকগণ আমাদের কথা বিবেচনা করেননি। তার ফলাফলটাও হয়েছে মারাত্মক। ইতালি থেকে আসা ১৪২ জনকে হোম কোয়ারাইন্টাইনে পাঠিয়ে দেয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশে প্রথম কোভিড-১৯ এর রোগি সনাক্ত হয়। এখন পর্যন্ত যে ১৭ জন রোগী সনাক্ত হয়েছে তাদের সবাই হয় কোভিড-২৯ এর মহামারী আক্রান্ত দেশ থেকে আগত অথবা তাদের পরিবারের সদস্য। অথচ শুরুতেই ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে আগত যাত্রীদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোয়ারাইন্টাইন করে রাখলে আজকে হয়ত আমাদের কোভিড-১৯ এর মহামারীর হুমকিতে পড়তে হত না।

বঙ্গবন্ধু কন্যা,
বর্তমান পরিস্থিতিতে কোভিড-১৯ এর মহামারী প্রতিরোধ করার কাজটি দুরূহ হয়ে গেলেও অসম্ভব নয়। আর এই দুরূহ কাজটির দায়িত্ব সরাসরি আপনাকেই নিতে হবে। সাধারণ মানুষ আপনি ছাড়া আর কারো উপরে ভরসা রাখতে পারছে না এবং সেগুলোর অনেক কারণও রয়েছে। ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস আমাদের আছে। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণাটি এবার সরাসরি আপনাকেই দিতে হবে। একটি অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় কখনই যে কোন বৈশ্বিক মহামারী (প্যানডেমিক) প্রতিরোধ করতে সক্ষম হতে পারে না, কোন দেশেই না। এর জন্য দরকার প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ, সাথে সাধারণ জনগণের সচেনতা, বেসরকারি খাতের শীর্ষ পর্যায়ের সক্রিয় সহযোগিতা। এই তিন ধরনের মানুষদের সমন্বয় করতে পারলে, আপনিই পারবেন, আর কারো পক্ষে এটি সম্ভব না। তাছাড়া কোভিড-১৯ মহামারিতে আক্রান্ত অন্যান্য দেশের সরকার প্রধানগণ যেমন নিয়মিত গণমাধ্যমের মুখোমুখি হচ্ছেন, আমরা চাই আপনিই এমনটি করবেন। স্বাধীনতা বিরোধী এবং তাদের সমর্থনকারী চক্রটি সব সময় মিথ্যা প্রোপাগান্ডা এবং গুজব সৃষ্টিতে ব্যস্ত থাকে। এরকম একটি চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখেও তাদের সেই ঘৃণকর্মটি থেমে নেই। এই মুহূর্তে আপনি জাতির উদ্দেশ্যে একটি দিক নির্দেশনামূলক ভাষণ দিলে শুধু আমরাই অনুপ্রাণিত হবো না, ঐ অপশক্তিরাও দুর্বল হতে বাধ্য। কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আপনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

★অবিলম্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কোভিড-১৯ এর মহামারী প্রতিরোধে একটি জাতীয় রেসপন্স টিম গঠন করা হোক, যার প্রতিটি কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে সরাসরি পরিচালিত হবে।

★জাতীয় রেসপন্স টিমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্মরত বিশেষজ্ঞগণকে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সম্পৃক্ত করা হোক। একজন বিশেষজ্ঞকে স্বাধীনভাবে মতামত প্রদানের সুযোগ দিতে হবে।

★সারা দেশে হোম কোয়ারাইন্টাইনে থাকা সকল ব্যক্তিকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারাইন্টাইন করা হোক। জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ভাড়া নিয়ে সেগুলোকে সাময়িক কোয়ারাইন্টাইন সেন্টার বানানো হোক। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হোক।

★যেসব সরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবাদানকারী যেমন ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ানদের জন্য এখনো পারসন্যাল প্রটেকশন ইকুপমেন্ট পাঠানো হয়নি, যত দ্রুত সম্ভব সরবারহ করা হোক।

★যত দ্রুত সম্ভব চীন বা অন্য কোন দেশ থেকে কোভিড-১৯ সনাক্ত করতে স্ক্রিনিং টেস্ট হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রচুর পরিমান কিট আমদানি করা হোক। সেগুলো সরকারি সব হাসপাতালের করোনা সেন্টার এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সরবারহ করা হোক। সব টেস্টের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হোক। এ ধরণের টেস্ট করতে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা খরচ হবে।

★কোভিড-১৯ নিয়ে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ সব ধরণের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের গুজব প্রতিহত করতে কঠোর নজরদারি করা হোক। প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হোক।

লিখেছেন: ডা. জাহিদুর রহমান, ভাইরোলজিস্ট
সহকারী অধ্যাপক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।

Comments

comments

Close