আজ: ১৩ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, বুধবার, ২৮শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী, রাত ৮:২২
সর্বশেষ সংবাদ
ফেসবুক থেকে, সম্পাদকীয় প্লিজ মাথা উঁচু করুন , আপনাদের নত মস্তক দেখতে চাই

প্লিজ মাথা উঁচু করুন , আপনাদের নত মস্তক দেখতে চাই


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ২১, ২০১৯ , ২:৩৫ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: ফেসবুক থেকে,সম্পাদকীয়


কবি নজরুল লিখে গিয়েছিলেন , ‘ মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু- মুসলমান । মুসলিম তার নয়ন-মনি, হিন্দু তাহার প্রাণ ।। এক সে আকাশ মায়ের কোলে যেন রবি শশী দোলে, এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ীর টান ।। এক সে দেশের খাই গো হাওয়া, এক সে দেশের জল, এক সে মায়ের বক্ষে ফলে এক ফুল ও ফল’ …।

অথচ আজ এতো বছর পর এসেও এদেশে মুসলিম ছাড়া ভিন্ন ধর্মালম্বী তথা অনেকের মতে ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতন হয়না সেটা বুকে হাত দিয়ে কেউ বলতে পারবে না । সাম্প্রদায়িক মনোভাব আমাদের মাঝে ঢুকে যায় স্কুলের প্রথম ক্লাস থেকেই কিংবা স্কুলে যাবার আগে খেলার ছলে পিঁপড়া মারতে গিয়ে লাল পিঁপড়া হিন্দু আর কালো পিঁপড়া মুসলিম সেটা শুনে জেনে …
ছোটবেলায় শিক্ষার সূচনা লগ্ন যে স্কুলে সেখানে স্কুল ড্রেসের সাথে টুপি বাধ্যতামূলক ছিল। নার্সারি থেকে ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছি সেখানে ।
এরপর পলিটেকনিক স্কুলে ক্লাস ফোরে , ফাইভে এসে লায়ন্সে। পলিটেকনিক স্কুলে প্রথম হিন্দু ক্লাস ফ্রেন্ড হিসেবে পাই তন্ময়কে । ইসলাম ধর্ম ক্লাসে একদিন হুজুর স্যার পড়াচ্ছিলেন অন্য ধর্মের কেউ মারা গেলে বলতে হবে “ফি নারি জাহান্নামাখলিদিনা ফিহা অর্থাৎ জাহান্নামের আগুনে অবস্থান করুক অনন্তকাল” ।আমি তখন বললাম স্যার তন্ময় তো আমার বন্ধু , তন্ময় মারা গেলেও কি এটা বলবো? সেদিন কোন উত্তর পাইনি ।
আমার আরেক শিক্ষক ছিলেন তিনি হিন্দুদের বেধর্মী বলতেন , আমি বলেছিলাম ‘স্যার ওরা যদি হিন্দুই হয় তাহলে ওরা বেধর্মী কি করে? হিন্দুধর্মই তো ওদের ধর্ম’। স্যার সরাসরি আমাকে বেয়াদব বলেছিলেন ।
আমার যে হিন্দু বন্ধুটি আমার বড় জ্যাঠা আর নানা মারা যাবার পর জানাজার সারিতে দাঁড়িয়েছে , যে আমার পাশে সব সময় থেকেছে , টিফিনে ভাগ করে খেতাম যার সাথে , আমার অসুস্থতায় যে কেঁদেছে আমি কি করে তাঁর আপনজন কিংবা তারই মৃত্যু হলে “ফি নারি জাহান্নামাখলিদিনা ফিহা’ বলবো ?
ক্লাস ফোরের সেই শিক্ষক মহাশয় আমায় মাফ করবেন , আমি বেয়াদব । আমি চাপিয়ে দেয়া সংস্কার মানতে নারাজ ।
আমার বন্ধু অমিত , হিমাদ্রি, সৌরভ, অন্তরা , অদিতি , ঊর্মি , শাওন এরা তো আমার আত্মার আত্মীয় । ধর্ম কখনো আমাদের মাঝে দূরত্ব আনতে পারেনি । পূজায় সৌরভের মা আমার জন্য আলাদাভাবে নাড়ু রাখেন , আমার পছন্দের খিচুড়ি রান্না করেন, আমার সহধর্মিণী প্রথমবার তাঁর বাড়িতে যাওয়ায় বরণডালা আর উপহার সামগ্রী দিয়ে বরণ করে নেয়া সৌরভের মা যেন আমার মায়েরই প্রতিচ্ছবি । শাওনের মায়ের কাছে আমার জন্য দুয়ার যেন ২৪ ঘণ্টা খোলা । বছরে অন্তত একবার হলেও তাঁর সাথে দেখা করতে যাই আমি ।
সন্তানসম ভালোবাসা পেয়েছি আমার হিন্দু বন্ধুদের মায়েদের থেকে ।
আমার অনেক মুসলিম বন্ধু হিন্দু বাড়িতে খাওয়া পাপ বলে গণ্য করে । আমার শুধু তাদের জন্য করুণা হয় । আর আমার হিন্দু বন্ধুদের আমারই কোন মুসলিম বন্ধু যখন “মালাউন” বলে তখন রাগে জ্বলে যাই আমি । আমার কাছে বন্ধুত্ব ধর্মের দেয়ালে আবদ্ধ নয় । কিছু মানুষের কাছে ব্যাপারটা এমন বলেই এখনো দেশে অন্য ধর্মের লোকেদের ভয়ে দিন কাটাতে হয় ।
গতকাল থেকে একটা ভিডিও টাইম লাইনে ঘুরছে । ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে এক মহিলা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ব্যাপারে বিচার দিচ্ছেন । সিআরআই ট্রাস্টি ফরহাদ ভাইয়ের সাথে একমত হয়ে আমিও বলতে চাই , প্রিয়া সাহা নামের ওই মহিলার বক্তব্য অবশ্যই অসত্য, কারণ তার দেয়া সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত ও ভুল। মিথ্যা তথ্যের ভিক্তিতে বিদেশী শক্তির কাছে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার প্রার্থনা রাষ্ট্রদ্রোহিতারই সামিল।

আমি বলছি না বাংলাদেশে সকল ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা একদম ভালো আছে, এরকম স্বপ্নের রাজ্যে থাকাও ঠিক না। আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি সব আমলেই ছিল এবং বর্তমানেও আছে। যারা সুযোগ পেলেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে করিয়ে দেন এই দেশ তাদের না। তফাৎ হলো বিএনপি জামাত ক্ষমতায় থাকলে এই গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রীয় মদদে তাদের জঙ্গিবাদী কার্যকলাপ চালাতে পারে। নির্বিচারে খুন, ধর্ষণ, দখল করতে পারে। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে পারে না। কিন্তু সুযোগ পেলেই উপাসনালয়ে হামলা, প্রতিমা ভাংচুর আর জমি দখল কিন্তু একদম থামেনি। তাই তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। আর সম্প্রীতির অবস্থা কি তা তো প্রিয়া সাহাকে সংখ্যাগুরুরা যে ভাষায় আক্রমণ করছে তা থেকেই বোঝা যায়। আসুন সাম্প্রদায়িক উস্কানীদাতাদের বিচার চাওয়ার পাশাপাশি নিজের অন্তরের সাম্প্রদায়িক জন্তুটিকেও আমরা বধ করতে শিখি। এক প্রিয়া সাহার জন্য যেভাবে হিন্ধু ধর্মের মানুষদের গালি দেয়া হচ্ছে তা অনুচিত এবং সত্যিই এটা করলে প্রিয়া সাহার সমপর্যায়েই আপনাকে মাপবো আমি … তখন আপনি আমার কাছে কীট বলেই গণ্য হবেন … আর হ্যাঁ এতক্ষণ ‘সংখ্যা লঘু’ শব্দের ব্যবহার করায় আমি লজ্জিত ও দুঃখিত । পারলে মাফ করবেন আমায় ।
আপনার যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কিংবা ভীত অবস্থায় আছেন তাদের বলছি , প্লিজ মাথা উঁচু করুন , আপনাদের নত মস্তক দেখতে চাই না । ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে কেনা এ বাংলার বুকে হিন্দু, খ্রিস্টান , বৌদ্ধ, আদিবাসী কেউই সংখ্যালঘু নয় । সংখ্যালঘু শব্দটিকে বাংলা অভিধান থেকে মুছে ফেলুন ।
এ বাংলার বুকে একমাত্র সংখ্যালঘু সেই ১৯৭১এ স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী রাজাকার, জামায়াত ও তাদের বংশধরেরা । আপনারা এ বাংলামায়ের সন্তান , বুক ফুলিয়ে চলুন।
আমার কাছে হিন্দু, বৌদ্ধ , খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নামে আলাদা সংগঠন মানে নিজেদের নিজেরাই সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিত করা । কেউ কেউ সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় নামে আলাদা মন্ত্রণালয়ের দাবি জানিয়েছেন , এসব মাথা মোটা লোকেরা কখনোই আপনাদের বিপদের সময় কাছে আসবে না , বিপদ ঘটে গেলে সেটা থেকে নিজে কিছু অর্জন করতে মাঠে নামবে । এদের এড়িয়ে চলুন ।
সারা দেশে যেখানে যারাই আপনাদের উপর নির্যাতনের চেষ্টা চালাবে তাদের প্রতিহত করুন । যারা ঘর বাড়িতে আগুন দিবে সেই আগুনে তাদের পুড়িয়ে মারুন । আপনার চুপ থাকাকে দুর্বলতা ভেবে নিয়েছে যারা তাদের প্রতিহত করার সময় এসেছে ।
আর হ্যাঁ অবশ্যই প্রিয়া সাহার বিচার চাইছি , কিন্তু কোন ভাবেই ধর্মীয় উস্কানি কিংবা অবমাননা চাই না ।

লিখেছেনঃ রাকিবুল বাসার রাকিব, সম্পাদক ও প্রকাশক , দৈনিক মতপ্রকাশ ।

Comments

comments

Close