আজ: ২৩শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার, ১০ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১১ই রমজান, ১৪৪২ হিজরি, দুপুর ২:২০
সর্বশেষ সংবাদ
সাহিত্য নীগার হালিমা নিশাতের গল্প : মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ

নীগার হালিমা নিশাতের গল্প : মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ০৩/০৫/২০১৯ , ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: সাহিত্য


অন্ধকার আমার খুব ভালো লাগে । ঘরের সব বাতি নিবিয়ে একলা চুপচাপ বসে থাকাটা রীতিমত আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ( আমার আম্মুর ভাষায় বদভ্যাস ) । খুব চুপচাপ থাকি আমি সবসময় । গল্পের বই কিংবা গানে বুদ হয়ে ডুবে থাকি বেশির ভাগ সময় । নিজেকে গল্পের চরিত্র গুলোর জায়গায় চিন্তা করি । কখনো সাজি হুমায়ূন আহমেদের নবনী , কখনো বা সুনীলের নীরা ; অথবা কারো একজনের সুহাসিনী । আমার ভাবতে খুব ভালো লাগে কেও একজন তার অসম্ভব মমতা দিয়ে আমার হাত ধরে ভালোবাসার কথা বলবে কোন একসময় । সেদিন আমি আমার বিশটি বসন্তের জমিয়ে রাখা ভালবাসা উজাড় করব তাকে । যতোটা সহজ করে আমি স্বপ্ন গুলো দেখি , আমার জীবনটা এতো সহজ না । নিম্ন বিত্ত ঘরের খুব সাধারণ মেয়ে আমি । কষ্ট করে মেধার জোরে দেশের সেরা বিদ্যাপীঠে পড়াশোনা করলেও ; আমার জীবন যাপন বড্ড ধোঁয়াটে । বাবার অক্ষমতা আমাকে কষ্ট দেয় । বৃষ্টির দিনে আমি ছাদে গিয়ে ভিজতে ভিজতে কাঁদি । আমার অসহায়ত্বের জন্য , আমার না পারার কষ্ট গুলোর জন্য । আম্মুনির ঘামে ভরা ক্লান্ত মুখ দেখে আমার খুব মায়া হয় । ভাবি কোন একদিন এই ক্লান্ত মুখটিকে ভরিয়ে দেবো তৃপ্তিতে । সেদিন পুরনো জিনিস পত্র গোছাতে গিয়ে অনেক কাল আগের একটা ডায়রি বেরিয়ে পড়ল । উপরে মোটা সোনালি অক্ষরে বাবার নাম লেখা । এই ডায়রির খবর আমি এতো দিন জানতাম না ! সব গুছিয়ে গোসল করে আমার ঘরে ডায়রিটা নিয়ে বসলাম । ছোট ছোট অক্ষরে লেখা সাজানো ভেতরে । ডায়রির ভেতরের সময়টা ১৯৭১ । ১২ – ১৩ বয়সী আমার বাবার লেখা । অস্থিরতা , প্রতিদিনের খুনসুটি ভরা দুষ্টুমির কথা পড়তে পড়তে হাসছিলাম আমি । বাবা এতো দুষ্ট ছিল ! পাশের বাড়ির এক মায়াবতীর প্রেমে পড়েছিল বাবা । এ বাড়ির ছাদ থেকে ও বাড়ির ছাদে চোখাচোখি , বাড়ির সবার অলক্ষে চিঠি চালাচালি – এই ছিল ওদের প্রেম । সময়টা খুব উত্তাল । বাড়ি থেকে পালিয়ে বাবাও চলে গেলেন যুদ্ধে । সেই মায়াবতী চোখের মেয়েটিকে বিদায় জানাতে পারলেন না। ভেবেছিলেন এসে বলে দেবেন সোজাসুজি ” ভালবাসি ” । ট্রেনিং শেষে নেমে পড়লেন ময়দানে । কত জীবন্ত গল্পের কাহিনী ওই ডায়রির পাতায় পাতায় । যুদ্ধ শেষে যখন ফিরলেন ঘরে , কেও ছিল না সেখানে । এ পাড়ায় , কিংবা ও পাড়ায় । পাশের বাড়ির কোন চিহ্নই নেই । পরে আছে ধ্বংসাবশেষ । যারা বেঁচে আছে শুনলেন তাদের মুখে একদিন খুব ভোরে বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছিল হানাদার রা সেই মায়াবতীর বাড়ি । কেও বের হতে পারেনি । সেদিন বাবার আকুতি ডায়রির পাতার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে যেন । পড়তে পড়তে চোখ ভিজে গিয়েছিল আমার । বুকের ভেতর কেমন যেন একটা চাপা কষ্ট বেরিয়ে আসছে সেই মায়াবতীর জন্য , আমার সাধাসিধে বাবাটার জন্য । বাবা কখনো বলেননি উনি যুদ্ধ করেছেন । গরবে আমার সমস্ত অপ্রপ্তির কষ্ট নিমেষেই উধাও হয়ে গেল । যে যুদ্ধকে নিয়ে গল্প লিখেছি আমি , সে যুদ্ধের একটা অংশ আমারই শান্ত বাবা , ভাবতেই অন্যরকম একটা ভালো লাগায় ভরে গেল মন । আমার বাবাটা খুব চুপচাপ ; আমার ই মতন অনেকটা । নিজে থেকে কিছু বলেন ই না । যেদিন বাবার প্রথম অসুখটা ধরা পড়ল , সেদিন বাবার মুখে আমি প্রথম নিজের অসহায়ত্তের জন্য কষ্ট দেখেছিলাম । আর যেদিন ডাক্তাররা সমস্ত চিকিৎসা বিফল হওয়ার কারনে তাদের অপারগতা জানিয়ে দিলেন , সেদিন বাবার আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না দেখে বুঝেছিলাম কি অসম্ভব রকমের ভালবাসা এই মানুষটা আমার জন্য বুকে পুষে রেখেছিল এতদিন । এখনো বাবার পাশে বসে আছি হাতটা ধরে ; হাসপাতালের জরাজীর্ণ আইসিইউ তে । আমার বাবা জীবনে হয়তো কিছু করতে পারেন নি , নিজের সংসারের জন্য , না নিজের জন্য । কিন্তু একটা দেশ কে স্বাধীনতা শব্দটা উপহার দিয়েছেন তিনি । নিজের এতো বড় পরিচয় লুকিয়ে রাখা মানুষ টিকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় , কেন মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নেননি ; তখন দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দেন ” সার্টিফিকেটের জন্য তো যুদ্ধ করিনি ” । নিজেকে তখন বড় সম্পূর্ণ মনে হয় , খুব তৃপ্তি জমে মনে । আমার জীবনে হয়তো কোন রাজপুত্র আসবে না , হয়তো কোন দেশের সাহসী বীর রাজ্য জয় করে হাঁটু গেঁড়ে ভালবাসা চাইবেনা আমার কাছে । কিন্তু আমি সেই সাহসী রাজপুত্রএর হাত ধরে বসে আছি , যে দেশের জন্য খুব অল্প বয়সে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল , যে দেশকে খুব সুন্দর একটা মানচিত্র দিয়েছিল , যে যুদ্ধে প্রেয়সীকে হারিয়ে খুব কষ্ট করে জীবন চালিয়েছিল । এবং তার রক্ত আমার শরীরে , তার জিন আমার প্রতিটি ডিএনএ তে । আমার অন্য কোন রাজপুত্রের দরকার নেই ।

 

লিখেছেনঃ নিগার হালিমা নিশাত 

 

 

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: