আজ: ২রা মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার, ১৭ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৮ই রজব, ১৪৪২ হিজরি, সন্ধ্যা ৭:১৭
সর্বশেষ সংবাদ
জেলা সংবাদ বেনাপোলে দুই বাংলার ভাষা প্রেমীদের মিলন মেলা

বেনাপোলে দুই বাংলার ভাষা প্রেমীদের মিলন মেলা


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ২১/০২/২০১৯ , ৪:০৭ অপরাহ্ণ | বিভাগ: জেলা সংবাদ


আরিফুজ্জামান আরিফ: 

‘বিশ্ব মানব হবি যদি, কায়মনে বাঙালি হ’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে এপার ওপার দুই বাংলার মৈত্রী পরিষদের আয়োজনে মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস যৌথভাবে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্যে দিয়ে এবারও পালন করেছে একসঙ্গে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একুশ মঞ্চে’ ।

বৃহস্পতিবার সকালে এভাবেই কাটালেন দুই বাংলার ‘বাংলা ভাষাভাষী’ মানুষ। সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে শহীদ বেদি ঢাকল ফুলের চাদরে।

বেনাপোল চেকপোস্ট নোম্যান্সল্যান্ডে স্থাপিত অস্থায়ী শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারো ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো হলো। মিষ্টি বিতরণ, আলোচনা আর গানে গানে মাতোয়ারা হলো দুই বাংলার একই আকাশ একই বাতাস।

উভয় দেশের জনপ্রতিনিধিরা বলেন, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির কথা। এ অনুষ্ঠানকে ঘিরে জড় হয়েছিল হাজার হাজার ভাষাপ্রেমী মানুষ। নেতাদের কণ্ঠে ছিল ভবিষ্যতে আরো বড় করে এক মঞ্চে একুশসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান উদযাপনের প্রত্যাশা। উভয় দেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো শতঃস্ফুর্তভাবে অংশ নেয় এ অনুষ্ঠানে।

দু’দেশের জাতীয় পতাকা, নানা রংয়ের ফেস্টুন, ব্যানার, প্লেকার্ড, আর ফুল দিয়ে বর্ণিল সাজে সাজানো হয় নোম্যান্সল্যান্ড এলাকা। দু’বাংলার মানুষের এ মিলন মেলায় উভয় দেশের সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে উৎসাহের সৃষ্টি হয়। প্রতি বছরই দুই বাংলার সীমান্তবর্তী এ অংশের বাসিন্দারা এক সাথে মিলিত হয়ে দিবসটি পালন করেন। তখন দুই দেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী ওই স্থানে আবেগাপ্লুত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একে অপরকে আলিঙ্গন করে সকল ভেদাভেদ যেন ভুলে যায় কিছু সময়ের জন্য। ফুলের মালা ও জাতীয় পতাকা বিনিময় করে উভয় দেশের আবেগপ্রবণ অনেক মানুষ বাঙালির নাড়ির টানে একজন অপরজনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন।

দুই বাংলার মানুষের মাঝে বসে এক মিলন মেলা। এ সময় পেট্রাপোল ও বেনাপোল চেকপোস্টে ঢল নামে হাজার হাজার মানুষের। ক্ষণিকের জন্য হলেও স্তব্ধ হয়ে যায় আন্তর্জাতিক সীমারেখা।

সকাল সাড়ে ১০টায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের খাদ্য সরবরাহ মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, বনগাঁ লোকসভার বিধায়ক শ্রীমতি মমতা ঠাকুর, উত্তর ২৪ পরগণা জেলা পরিষদের সভাধিপতি বীনা মণ্ডল, সহ-সভাপতি শ্রীকৃষ্ণ গোপাল ব্যানার্জী, বনগাঁ বিধানসভার বিধায়ক বিশ্বজিৎ দাস, বনগাঁ পৌরসভার প্রধান শঙ্কর আঢ্য, সাবেক পৌরপ্রধান জ্যোৎস্না আঢ্য ও সিআইসি দমদম পৌরসভার শ্রীমতি রিঙ্কু দে দত্ত নেতৃত্বে ভারত থেকে আসা শতশত বাংলাভাষী মানুষ বাংলাদেশিদের ফুলের পাঁপড়ী ছিটিয়ে ও মিষ্টি দিয়ে বরণ করে নেয় একে অপরকে।

নোমান্সল্যান্ডে অস্থায়ী শহীদ বেদীতে প্রথম ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান উভয় দেশের জনপ্রতিনিধিসহ সরকারি কর্মকর্তারা। বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পল্লী ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য, যশোর-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ শেখ আফিল উদ্দিন, বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার বেলাল হোসাইন চৌধুরী, যশোর জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল, যশোর পুলিশ সুপার মঈনুল হক, বেনাপোল বন্দর পরিচালক (ট্রাফিক) প্রদোষ কান্তি দাস, ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়ন পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুল হক, শার্শা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক মঞ্জু ও শার্শা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ নূরুজ্জামান।

এ সময় উভয় দেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অংশ নেয় এ অনুষ্ঠানে। ভাষা দিবসের মিলন মেলায় বিজিবি বিএসএফকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। এরপর দু’দেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে হাজার হাজার ভাষাপ্রেমী মানুষ দিবসটি উদযাপন করে যৌথভাবে।

এ সময় ভাষার টানে বাঙালির বাঁধন হারা আবেগের কাছে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় দু’বাংলার মানুষ। এর মধ্য দিয়ে বোঝা গেল রফিক, শফিক, বরকত ও সালামের তরতাজা রক্ত বৃথা যায়নি। ভাষার আকর্ষণ ও বাঙালির নাড়ির টান যে কতটা আত্মিক ও প্রীতিময় হতে পারে তাও বুঝিয়ে দিল মহান একুশে ফেব্রুয়ারি।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি পল্লী ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য বলেন, দুই বাংলার মানুষ আজ আমরা এক হয়েছি। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন আমাদের অধিকার বোধের জন্ম দিয়েছিল। সালাম, বরকত, রফিক, শফিক জব্বারসহ হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষার যে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা বিশ্বে বিরল।

তিনি বলেন,  প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নের্তৃত্বে গণতন্ত্র বিকশিত হতে শুরু করেছে। ভাষা ও ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের দুই দেশের মধ্যে উপস্থিত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ভিতকে আরো শক্ত করবে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, আমি বাংলায় কথা বলি পুনঃজন্মে আমি বাঙালি হয়ে জন্মাতে চাই। কাঁটাতারের বেড়া আমাদেরকে আটকাতে পারে কিন্ত আমাদের আবেগকে আটকাতে পারবে না। আগামী ২০ বছর পর দু’বাংলা এক হয়ে যাবে। দুই বাংলার কত বাঙালি জন্মগ্রহণ করেছে সবাই বাংলায় কথা বলেন। দুই বাংলায় কত নামি-দামি কবি সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্রোপাথ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, শেখ মুজিবর রহমান। ভাষার জন্য রফিক সালাম বরকত শফিক জীবন দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান নিজের জীবন দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করে একটি ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন। ভাষা আর স্বাধীনতার জন্য এত ত্যাগের নজির পৃথিবীতে অন্য কারোর নেই।

তিনি বলেন, ভাষার টানে আমরা বাংলাদেশে ছুটে এসেছি একুশ উদযাপন করতে। দু’বাংলার মানুষ একসাথে মাতৃভাষা দিবস পালন করছি। দু’বাংলার মানুষের মিলন মেলার মধ্য দিয়ে দু’দেশের বন্ধুত্ব আরো সুদৃঢ় হবে। আমার এসেছি অন্তরের টানে। বার বার ছুটে আসি। আগামী বছর থেকে আমরা বেনাপোল পেট্রাপোল একুশে অনুষ্ঠানের কথা বলবো না। বলবো বাংলার অনুষ্ঠান।

মঞ্চে একুশের কবিতা আবৃতি, ছড়া, গীতিনাট্য, আলোচনা আর সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়া ছিলেন ভাষাসৈনিক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ ভাষা আন্দোলন কেন্দ্রের পরিচালক এস আর মাহবুব, সংগীতশিল্পী মইনুল আহসান নোবেল, নূরজাহান আলীম, পৌষালী ব্যানার্জী, আবৃত্তি শিল্পী শাহদত হোসেন নিপু ও অন্যান্য শিল্পীরা।

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: