আজ: ১১ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার, ২৮শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৯শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি, রাত ১২:২৫
সর্বশেষ সংবাদ
খুলনা বিভাগ, প্রধান সংবাদ, বিভাগীয় সংবাদ খুলনা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চলছে হরিলুট !

খুলনা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চলছে হরিলুট !


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ০৯/০২/২০১৯ , ২:৪১ অপরাহ্ণ | বিভাগ: খুলনা বিভাগ,প্রধান সংবাদ,বিভাগীয় সংবাদ


একরামুল কারিম , খুলনা ব্যুরোঃ নগরীর খালিশপুর গোয়ালপাড়াস্থ ঐতিহ্যবাহী খুলনা বিদ্যুৎ কেন্দ্র অভ্যন্তরে চলছে খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট ডুয়েল ফুয়েল কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজের প্রস্তুতি। প্রাথমিক কাজের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রবেশের পূর্বপাশের পুরো এলাকার অধিকাংশ ভবনই ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। শুধুমাত্র পশ্চিমের আবাসিক এলাকা ও মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় স্কুলের নির্মাণ কাজ শেষ হলেই পুরাতন স্কুল ভবনটিও ভেঙ্গে ফেলা হবে। তবে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কুড়িয়ে পাওয়া বোমায় নিহত ছয়জন কর্মকর্তার কবর রেখে দিয়েই নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থাপন কাজ শুরু হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। এ কেন্দ্রটি নির্মাণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন পর হলেও খুলনা বিদ্যুৎ কেন্দ্র অভ্যন্তরে চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। যদিও পুরাতন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ১১০ ও ৬০ মে:ও: কেন্দ্রের স্থাপনা এখনও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া অন্যসব স্থাপনা নেই বললেই চলে। তারপরেও আশার আলো দেখছে খুলনার মানুষ। নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন হলে সেখানে আবারো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। জাতীয় গ্রীডেও যুক্ত হবে তিনশ’ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ। ঠিক এমন কর্মযজ্ঞের মধ্যেও যেন অনেকটা হরিলুট চলছে সেখানে। যেসব স্থাপনার টেন্ডার দেয়া হয়েছে তার সাথে সিডিউলের বাইরের অনেক মালামাল যেমন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তেমনি রাতের আধাঁরে সিকিউরিটি গার্ডদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মূল্যবান ক্যাবলসহ অনেক মালামাল চুরি করে নিয়ে যাওয়ারও বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে কয়েকটি মামলাও দায়ের হয়েছে কেএমপির খালিশপুর থানায়। কিন্তু এসব অপকর্মের সাথে কোন কোন রাজনৈতিক নেতা জড়িত থাকায় তদন্ত কাজও অনেকটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া নিলামে বিক্রি মালামাল ডেলিভারী কমিটির সাথে সম্পৃক্ত নন এমন দু’একজন কর্মকর্তার যোগসাজশের বিষয়টিও উঠে এসেছে পুলিশী তদন্তে। যদিও ওইসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখনও যৌক্তিক কোন পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়নি নানা কারণে। সব মিলিয়ে খুলনা বিদ্যুৎ কেন্দ্র অভ্যন্তরে নতুন কেন্দ্র স্থাপন প্রক্রিয়ার শুরুতেই এমন দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তিন হাজার ২৭৩ কোটি টাকার এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও অনেক প্রশ্ন উঠতে পারে এমন আশংকাও সংশ্লিষ্টদের।

খুলনা ৩৩০ মেঃওঃ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক জ্যোতির্ময় হালদার বলেন, কেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে টেষ্ট পাইল নির্মাণ হয়েছে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের সাথেও ইতোমধ্যে ঋণ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ডিসেম্বর মাসের ১০ তারিখ ঋণ চুক্তির পর গত ২৪ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের গ্যারান্টি দেয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ৪১৭ কোটি টাকা ডাউন পেমেন্ট দেয়া হয়েছে। এখন চীন দু’হাজার ৩৭০ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার পর বাকী টাকা বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড দিলেই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। 

এদিকে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পের লে-আউট এলাকার বিভিন্ন স্থাপনার অপসারিত মালামাল এবং কর্তনকৃত গাছপালা নিলামে বিক্রির সিডিউল অনুযায়ী মালামাল নেয়ার পরিবর্তে মাটির মধ্যে রক্ষিত মূল্যবান আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সিডিউলের কোথাও আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল নেয়ার কথা উল্লেখ না থাকলেও ডেলিভারী কমিটির কোন কোন কর্মকর্তার সহায়তায় তা’ নেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে ডেলিভারী কমিটির আহবায়কের সহযোগিতায় খুলনা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী কমিটির সদস্য না হয়েও ওইসব মালামাল সরিয়ে দিতে সহায়তা করছেন এমন অভিযোগও উঠেছে। যেটি সম্প্রতি খালিশপুর থানায় দায়েরকৃত একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়েও পুলিশের কাছে স্পষ্ট হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যদিও ওই উপ-সহকারী প্রকৌশলী বর্তমানে মৌখিক ছুটিতে খুলনার বাইরে অবস্থান করছেন।

এ প্রসঙ্গে কমিটির আহবায়ক ও খুবিকে’র ম্যানেজার(সংরক্ষণ) নাহিদ রহমান বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার এক আত্মীয় অসুস্থ বিধায় জরুরিভাবে বরিশালে চলে গেছেন। জরুরি কারণে মৌখিক ছুটির বিধান আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অবশ্য খুবিকে’র প্রধান প্রকৌশলী(ভারপ্রাপ্ত) শেখ শহীদুজ্জামান বলেন, ছুটির দরখাস্ত একজন কর্মকর্তার কাছে রেখে যাওয়ার কথা। 

খুবিকে’র অপর একটি সূত্র বলছে, সম্প্রতি খালিশপুর থানায় দায়েরকৃত একটি মামলায় গ্রেফতারকৃত সাত ব্যক্তির জবানবন্দিতে ওই কর্মকর্তার নাম আসার পর থেকেই তিনি গাঁ-ঢাকা দিয়েছেন। যেটি প্রমাণিত হবে আজকালের মধ্যে তার কর্মস্থলে যোগ দেয়া বা না দেয়ার মধ্যদিয়ে। তাছাড়া এর আগে একজন ষ্টোর কীপারকে মারধরের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় যাদের নাম উঠে এসেছে বা সিসি ক্যামেরার ফুটেজে যাদের দেখা গেছে তারাও রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনকি ওই মামলায় যারা গ্রেফতার হয়েছিলেন তারাও জামিনে মুক্ত হয়ে ক্ষমতাসীন দলের কোন কোন নেতার ছত্রছায়ায় রয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
খুবিকে’র এসব মালামাল পাচারের সাথে খালিশপুর এলাকার একজন সাবেক ও একজন বর্তমান জনপ্রতিনিধির নাম শোনা গেছে। প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রয়েছেন খুবিকে’র ক্ষমতাসীন দলের একাংশের একজন নেতাও। তাদের ছত্রছায়ায় অপর দু’ বহিরাগত ব্যক্তি খুবিকে’র একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলীর সাথে আঁতাত করে লাখ লাখ টাকার ক্যাবল ট্রাকযোগে নিয়ে যাচ্ছেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে।
তবে এ প্রসঙ্গে খুবিকে’র সহকারী প্রকৌশলী(নিরাপত্তা) শেখ ওলিয়ার রহমান বলেন, যেহেতু তিনি ডেলিভারী কমিটির সদস্য নন, সেহেতু কি কি মালামাল নেয়া হচ্ছে সেটিও দেখার এখতিয়ার তার নেই। তবে তিনি আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে রাখা ও চুরি ঠেকাতে যেটুকু দায়িত্ব পালনের এখতিয়ার রাখেন সেটুকু যথাযথভাবে পালন করছেন বলেও জানান।
খুবিকে’র বিভিন্ন স্থাপনার অপসারিত মালামালের সাথে মূল্যবান আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল পাচার সম্পর্কে খুবিকে’র প্রধান প্রকৌশলী শেখ শহীদুজ্জামান বলেন, এটি সঠিক নয়। কারণ ইতোমধ্যেই অনেক ক্যাবল উদ্ধার করে ষ্টোরে জমা করে রাখা হয়েছে। তাছাড়া ডেলিভারীর জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও তিনি জানান।
সম্প্রতি অপসারিত মালামাল বহনকারী একটি ট্রাকের পিছু নিয়ে দেখা গেছে, গোয়ালখালীস্থ শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের পশ্চিম পাশের হাউজিং আবাসিক এলাকায় সেগুলো ফেলা হচ্ছে। আর সেখানে পূর্ব থেকে অক্ষেমাণ থাকা এক ব্যক্তি লোহার রড ও ক্যাবল বাছাই করে আলাদা জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন। জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি নিজেকে মকবুল বলে পরিচয় দেন এবং তার বাড়ি গোয়ালখালী কবরস্থানের পাশে বলেও জানান।
উল্লেখ্য, খুবিকে’র ৩৩০ মেঃ ওঃ ডুয়েল ফুয়েল কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের লে-আউট এলাকার বিভিন্ন স্থাপনার অপসারিত মালামাল সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাজটি কিনে নিয়েছেন খালিশপুর এলাকার নয়টি ওয়ার্ডের নয়জন রাজনৈতিক নেতা। তারাই সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে নিজেদের মালামালের পাশাপাশি আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলসহ মূল্যবান মালামাল নিয়ে যাচ্ছেন এমঅভিযোগ উঠেছে।

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: