আজ: ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার, ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৯শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি, সকাল ১০:০১
সর্বশেষ সংবাদ
বাংলাদেশ, ভ্রমন স্থাপত্য শৈলীর শিবালয় শিবমন্দির

স্থাপত্য শৈলীর শিবালয় শিবমন্দির


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ৩১/১২/২০১৮ , ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: বাংলাদেশ,ভ্রমন


জয়পুরহাটের বারো শিবালয় শিবমন্দিরটি প্রাচীন স্থাপত্যের নৈপূণ্যে আজো দাঁড়িয়ে আছে। যার সংখ্যা বারোটি। একই আঙ্গিনার চারপাশে গায়ে গায়ে প্রায় ঠেকানো এই মন্দিরগুলো বেল আমলা বারো শিবালয় নামেই পরিচিত। এটি মারোয়ারী এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের পবিত্র তীর্থস্থান। সাধারণতঃ একই স্থানে পূজা অর্চনার জন্য একটি মন্দির থাকে।

বারো শিবালয়ের সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ অবস্থা পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হয় যে রাজা বল্লাল সেন (শিব শিবের) উপাসক ছিলেন বলেই তিনি এই মন্দির স্থাপন করেন। আর কারো কারো মতে, ইতিহাস পরিচিত জগৎ শেঠের বিত্তবান ছিলেন লোচন মণ্ডল নামে এক ব্যক্তি যিনি বারো শিবালয় মন্দিরটি নির্মাণ করেন।

বেলআমলা হতে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য মতে এবং সেখানে থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন প্রকার চন্ডীমূর্তি, সূর্যমুক্তি, বাসুদেবমুর্তি দেখে ধারণা করা হয় এককালে এখানে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরও তীর্থ স্থান ছিল।

রাজীব লোচনা মন্দলের বংশের অধস্তন জ্ঞান্দ্রেনাথ চৌধুরী একসময় এখানকার বিশাল জমিদারির মালিক ছিলেন। পরে (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি) কর্তৃক জমিদারি নিলামে উঠার পর থেকে বেলআমলা গ্রামে জমিদারির পতন হয়। পর্যায়ক্রমে গতিনাথ দত্ত চৌধুরী ও তার পুত্র গিরীলাল দত্ত চৌধুরীর সময় জমিদারি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

কিন্তু কি কারণে একই জায়ঘায় এতগহুলো শিব মন্দির নির্মিত হলো, সে কথা এখনো অজানাই রয়ে গেছে। সেদিক থেকৈ ধর্মপ্রাণ মারোয়ারী ও হিন্দু নর-নারীর জন্য বারো শিবালয় মন্দিরটি এক আলাদা গুরুত্ব বহন করে। জয়পুরহাট শহর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে দৃষ্টি নন্দন এই বারো শিবালয় মন্দিরটি বেল আমলায় অবস্থিত।

প্রায় এক হাজার বছর পূর্বে ভারতের মুর্শিদাবাদের জমিদার রাজীব লোচন এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন। মন্দিরটি নির্মাণের নির্দিষ্ট কোন উদ্দ্যেশ্য জানা না গেলেও এর উচু চ‚ড়া মালার সৌন্দর্য্য শুধ ধর্ম প্রাণ মারোয়ারী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকেই কাছে টানেনা বরং সকল ধর্মের মানুষকেই আকৃষ্ট করে।

এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর ফাগুনমাসের চতুর্দশীতে শিবরাত্রি এ বারো শিবালয়কে ঘিরে পূজা অর্চনা হয়। শিবরাত্র উপলক্ষে হয় বিশাল মেলা। মেলায় মানত, শিবদর্শন, গীতা পাঠ, উলুধ্বনি। ঢাক ঢোলের বাজনায় সারা এলাকা মুখরিত হয়। এছাড়া মেলায় দেশেল সুখ-সমৃদ্ধি ও মানব কল্যাণে শিবঠাকুর কে সন্তষ্ট করতে আলো আধারির মাঝে কীর্তন গানের অনুষ্ঠান করা হয়। মেলায় শাখা-সিদূর, পৈতা, তিলক, পুতির মালা, কাঠের জালি, পুতুল খেলনা, ঘর সাজানোর জিনিষপত্রসহ, বিভিন্ন প্রকার আসবাবপত্র বেচা কেনা জমে উঠে। বিভিন্ন পূজা-পার্বনে ব্যাপক ভক্ত সমাগমের কথা বিবেচনা রেখে তৈরী করা হয় মন্দির প্রাঙ্গনের দক্ষিণ ভিটায় ৫টি কক্ষের বেশ বড় অতিথিশালা, পশ্চিম ভিটায় রন্ধনশালা ও মাঝখানে একটি হোমঘর।

এছাড়াও এখানে শ্রাবন মাসের শেষ সোমবার শেলায় পায়ে হেঁটে বিভিন্ন জেলাসহ ভারত থেকে মারোয়ারী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা কাউর তুলে শিবের মাথায় পানি ঢালে। অতপর পূজা অর্চনা শেষে তারা গঙ্গার জলে পুন্ন্য স্নান সেরে বাড়ি ফেরে। হাজার বছরের এই ধর্মীয় উপাসনালয় এক সময় কালের করাল প্রবাহে হারিয়ে যেতে বসেছিল। ভাঙ্গনের রেখে স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল দীর্ঘ প্রাচীর দেহে। ঝর-বৃষ্টি, ভূমিকম্প সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নির্জন প্রান্তরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় লোকজনদের অভহেলা, উদাসীনতা আর প্রয়োজনীয় দৃষ্টিমূলের অভাবে নষ্ট হতে চলেছিল এই মন্দিরটি।

ঠিক সেই সময়ে শিবের প্রধান ভক্ত জয়পুরহাটের মারোয়ারী সম্প্রদায় এগিয়ে আসেন মন্দিরগুলো সুরক্ষার কাজে। স্থানীয় হিন্দুরাও তাদের পাশে দাঁড়ায়। প্রধানত, মারোয়ারী সম্প্রদায়ের উদ্যোগ ও সময় মতো পদক্ষেপেই বারো শিবালয় মন্দিরটি রক্ষা পায়। সৌন্দর্য, পিয়াসী এবং পর্যটকসহ অসংখ্য মানুষকে প্রতিনিয়িত কাছে টানে জয়পুরহাটের এই প্রাচীন বারো শিবালয় মন্দিরটি।

জয়পুরহাট সদরের ইউএনও আমিনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি নিজেও পরিবারসহ ২ বার পরিদর্শনের উদ্দেশে বেড়াতে গিয়েছিলাম। স্থানটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মনোরোম পরিবেশ। দর্শনীয় স্থানটি নিয়ে যেহেতু তাদের কোন মতামত বা ভবিষ্যত পরিকল্পনা থাকে বিষয়টি আমাকে অবহিত করবে। আমি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করবো। প্রয়োজনে প্রাচীন স্থাপত্য শৈলী দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

Comments

comments

Close