আজ: ৮ই মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার, ২৩শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৪শে রজব, ১৪৪২ হিজরি, ভোর ৫:৪৭
সর্বশেষ সংবাদ
প্রবাস, ফেসবুক থেকে, সম্পাদকীয় বাংলাদেশ ভবনে শহীদ মিনার চাই

বাংলাদেশ ভবনে শহীদ মিনার চাই


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ২৫/০৫/২০১৮ , ১২:০২ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: প্রবাস,ফেসবুক থেকে,সম্পাদকীয়


১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করে বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধুমাত্র একজন বাঙালি কবি-ই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমকালীন বিশ্বের একজন উচ্চমানের দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক। জমিদার হয়েও তিনি ছিলেন প্রজাসাধারণের নিজেদের লোক। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে, কর্মে ও চিন্তায় তৎকালীন ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই। আর তাইতো বিংশ শতাব্দীর ভারতবর্ষে বসেও রবীন্দ্রনাথ “বিশ্বভারতী” নামক অনবদ্য শিল্পকর্মের কল্পনা করতে পেরেছিলেন এবং তা বাস্তবায়নও করে গিয়েছিলেন। বিশ্বভারতীর ন্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিলো সমকালীন বিশ্বের যাবতীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি এক তীক্ষ্ণ তিরস্কার! প্রকৃতিতে থেকে, প্রকৃতির সাথে মিশে, প্রকৃতি থেকে জ্ঞানার্জনের এমন অনবদ্য প্রতিষ্ঠান পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আছে কি না, আমার জানা নেই। আর তাই, আমি বিশ্বভারতীকে বলি রবীন্দ্র-জীবনের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম।

বাঙালির রবীন্দ্রনাথ নশ্বর পৃথিবীর পাট চুকিয়েছেন ১৯৪১ সালে। এর মাত্র এক দশক পরেই রবীন্দ্রনাথের “বিভক্ত” বাংলায় ঘটলো বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক এবং বাঙালি জাতির গৌরবময় এক ঘটনা। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীতে ঢাকার রাজপথে কৃষ্ণচূড়া আর বাঙালির রক্ত মিলেমিশে একাকার হলো, বাসন্তী কোকিলের স্তবধনি হারিয়ে গেলো ঘাতকের বুলেটের শব্দে।পৃথিবীর একমাত্র জাতি হিসেবে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলনরত বাঙালি বুকের রক্ত দিলো, শহীদ হয়ে মাতৃভাষার সম্মান অটুট রাখলো। রবীন্দ্রনাথ বুঝি স্বর্গের অধিবাসীদের ডেকে গেয়ে শোনালেন সেই অমর সঙ্গীত-চরণ, “মা, তোর মুখের বাণী- আমার কানে লাগে সুধার মতো”!

রবীন্দ্রনাথের বাংলায় সবচেয়ে গৌরবময় ইতিহাস তৈরি হলো ১৯৭১ সালে। রবীন্দ্রনাথেরই এক স্নেহাশীষ ভক্ত হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচনা করলেন এক অমর কবিতা- শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে একাত্তরের দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জয়লাভ করে বিশ্বের মানচিত্রে স্থানুলাভ করলো বাংলা ও বাঙালির একমাত্র জাতিরাষ্ট্র “বাংলাদেশ”। সেই থেকে বাংলা, বাঙালি আর রবীন্দ্রনাথ যেন পেলো এক নতুন পরিচয়। শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি” গানটি হয়ে উঠলো বিশ্বসভায় বাঙালি জাতির পরিচয় সঙ্গীত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বপ্নের সেই বিশ্বভারতীতে কি যেন একটা ছিলো না, কিসের যেন একটা অভাব সবসময় পরিলক্ষিত হতো বিশ্বভারতীর সবখানে। এই অভাব বুঝি এতোদিনে পূর্ণ হতে চলেছে। বাংলা আর বাঙালির প্রবাদপুরুষ রবিঠাকুরের বিশ্বভারতীতে বাঙালি জাতির গৌরবময় আখ্যান “বাংলাদেশ” নামক রাষ্ট্রের পরিচয়বাহী অনবদ্য এক স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। নামটিও চমৎকার –“বাংলাদেশ ভবন”।

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে “বাংলাদেশ ভবন” নির্মাণের বিভিন্ন প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের এক বৈঠকে ভবনটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। সেই প্রেক্ষিতে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়া দুই বিঘা জমিতে বাংলাদেশ সরকারের ২৫ কোটি রূপী অর্থায়নে ৪১০০ বর্গমিটার আয়তনের ভবনটি নির্মাণ শুরু হয় ২০১৬ সালের শেষদিকে। দীর্ঘ আঠারো মাসে প্রতিদিন গড়ে দুইশত শ্রমিকের পরিশ্রমে নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে, যা আগামী ২৫ শে মে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করবেন। উক্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও উপস্থিত থাকবেন।

বাংলাদেশ ভবনটিতে রয়েছে দুটি সেমিনার হল (২৬৪ বর্গমিটার), একটি লাইব্রেরী (১১৫ বর্গমিটার) এবং দুটি স্টাডি সেন্টার। মোট ৪৫৩ জন একসাথে বসে অনুষ্ঠান উপভোগের জন্য তৈরি করা হয়েছে ৬০০ বর্গ মিটারের বিশ্বমানের একটি অডিটোরিয়াম। এছাড়াও নানাধরনের আধুনিক সুবিধা সম্বলিত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি একটি যাদুঘর রাখা হয়েছে। ভবনের সামনের দেয়ালের দুইদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল তৈরি হচ্ছে।

বিশ্বভারতীর বাংলাদেশ ভবন দুই বাংলা ও দুই রাষ্ট্রের আন্তঃসম্পর্ক আরও জোরদার করবে বলেই সংশ্লিষ্ট সকলের অভিমত। তবে, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীতে বাংলাদেশ ভবন থাকবে, অথচ, বিশ্বসভায় বাঙালির গৌরবময় বায়ান্নর ভাষাশহীদদের স্মরণে কোন শহীদ মিনার থাকবে না- এমন হতে পারে না। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেয়ায় বাঙালির একুশে ফেব্রুয়ারী এখন সারাবিশ্বে বাংলা ভাষার মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর দেশে দেশে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে নির্মিত হচ্ছে অমর একুশে শহীদ মিনার। এমতাবস্থায়, বাঙালির অন্যতম তীর্থস্থান বিশ্বভারতীতে শহীদ মিনার থাকাটা অপ্রাসঙ্গিক তো নয়ই, বরং অতীব জরুরী।

ভারতে অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ভাইয়ের নেতৃত্বে রবিঠাকুরের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম-জেলায় অবস্থিত বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী শহীদ মিনার স্থাপনের জন্য আমরা নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যেই আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন, বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রনালয় ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট –সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন জানিয়েছি।একইসাথে কলকাতা প্রেসক্লাব, বর্ধমান প্রেসক্লাব -সহ দুইদেশের সাংবাদিক বন্ধুরা আমাদের আবেদনের খবরটি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।

এমন এক সময়েই আগামী পঁচিশে মে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত “বাংলাদেশ ভবন” উদ্বোধন করবেন। সেখানে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উপস্থিত থাকবেন। সেই ঐতিহাসিক শুভলগ্নে বাংলাদেশ ভবন প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার স্থাপনে আমাদের দীর্ঘদিনের দাবিটি আলোর মুখ দেখবে বলে আশা রাখি। এবং যদি সত্যিই তা ঘটে, তবে এটিই হবে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার।

লেখক:

মোহাম্মদ মেহেদী কাউসার ফরাজী , শিক্ষার্থী ও যুগ্ম-সম্পাদক, ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

 

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: