আজ: ৮ই মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার, ২৩শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৪শে রজব, ১৪৪২ হিজরি, রাত ৮:৫৫
সর্বশেষ সংবাদ
ধর্ম কথন শবেবরাত নিয়ে কিছু কথা

শবেবরাত নিয়ে কিছু কথা


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ০১/০৫/২০১৮ , ১১:৩৪ অপরাহ্ণ | বিভাগ: ধর্ম কথন


আজকাল কিছু কিছু বন্ধু কারো কারো কথা শুনে কিংবা কোনো কোনো লেখা দেখে সংশয়ে পড়েন যে আদৌ ১৫ শাবানের রাত্রির কোনো ফজিলত বা বিশেষত্ব আছে কি না। বাস্তব কথা হলো, শাবানের পুরো মাসটাই ফজিলতপূর্ণ ও বরকতময়। নবীজি (সা.) এ মাসের বরকত কামনা করে দোয়া করতেন। রমজান মাসের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে এই মাসে তিনি বেশি বেশি রোজা রাখতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবীজি (সা.)-কে রমজান ছাড়া কখনো পূর্ণ কোনো মাস রোজা রাখতে আমি দেখিনি। আর শাবান মাসে তিনি যেভাবে অধিক হারে রোজা রাখতেন, বছরের অন্য কোনো মাসে এমনটা করতেন না।’ [(বুখারি, হাদিস : ১৬৮৬) সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯৫৬]

হজরত উসামা ইবনে জায়েদ (রা.) নবীজি (সা.)-কে শাবান মাসে অধিক রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ মানুষ এ মাসের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। অথচ এটি এমন একটি মাস, যে মাসে আল্লাহর কাছে বান্দাদের আমলনামা পেশ করা হয়। অতএব, আমি চাই, আমার আমলনামা এমন অবস্থায় পেশ করা হোক, যখন আমি রোজাদার।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২১৭৫৩, নাসাঈ, হাদিস : ২৩৫৭)

নবীজি (সা.) তাঁর উম্মতকে এই মাসের একটি রাত সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন যে ওই রাতে দোয়া কবুল হয়। হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, ‘অর্ধ শাবানের রাতে আল্লাহ সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। অতঃপর শিরককারী ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া গোটা সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৫৬৬৫)

আজকাল যেসব বন্ধু শবেবরাত সম্পর্কে সন্দিহান, তাঁরা যেসব মনীষীর অনুসরণ ও অনুকরণ করে থাকেন, তাঁদের বহু বরেণ্য আলেমও ১৫ শাবানের রাত্রির ফজিলতের কথা স্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেছেন, এসংক্রান্ত হাদিস গ্রহণযোগ্য! উদাহরণস্বরূপ এখানে কয়েকজনের উদ্ধৃতি পেশ করা হলো—

শায়খুল ইসলাম হাফিজ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ১৫ শাবানের রাতের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক ‘মারফু’ হাদিস ও সাহাবির আসার বা উক্তি বর্ণিত হয়েছে। এগুলো দ্বারা ওই রাতের ফজিলত ও মর্যাদা প্রমাণিত হয়। সলফে সালেহিনের কেউ কেউ এ রাতে নফল নামাজের ব্যাপারে যত্নবান হতেন। আর শাবানের রোজার ব্যাপারে তো সহিহ হাদিস আছেই। কোনো কোনো আলেম যদিও এই রাতের ফজিলত অস্বীকার করেন, কিন্তু হাম্বলি ও অহাম্বলি বেশির ভাগ আলেমই এই রাতের ফজিলতের কথা স্বীকার করে থাকেন। ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর মতও তা-ই। কেননা এর ফজিলত সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে এবং এগুলোর সমর্থনে সালাফ (সাহাবি ও তাবিয়ি)-এর উক্তিও বিদ্যমান আছে, যেগুলো ‘সুনান’ ও ‘মুসনাদ’ শিরোনামে সংকলিত হাদিসের কিতাবে (বরং কতক ‘সহিহ’ শিরোনামের কিতাবেও যেমন—সহিহ ইবনে খুযায়মা, সহিহ ইবনে হিব্বান প্রভৃতিতে) রয়েছে। (দেখুন : ইকতিজাউস সিরাতিল মুসতাকিম, ২/৬৩১, মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ, এ বিষয়ে তাঁর আরো উক্তি জানতে দেখুন : মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩/১৩১-১৩২)

মুহাদ্দিস আবদুর রাহমান মুবারকপুরী (রহ.) বলেন, ‘শাবানের ১৫ তারিখ রাতের ফজিলতের ব্যাপারে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর সমষ্টি থেকে বোঝা যায় যে এর একটি ভিত্তি রয়েছে।’ তিনি এসংক্রান্ত কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করে বলেন, ‘যাঁরা এ রাতের ফজিলত ভিত্তিহীন বলে মনে করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে এসব হাদিস অকাট্য দলিল।’ (দেখুন : তুহফাতুল আহওয়াজি শারহু সুনানিত তিরমিজি, ৩/৪৪১-৪৪২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৩৯৯ হিজরি)

বর্তমান সময়ে আমাদের সালাফি বন্ধুদের নন্দিত মুহাদ্দিস, শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানি (রহ.) ১৫ শাবানের রাতের ফজিলতবিষয়ক একটি হাদিস সম্পর্কে ‘সহিহ হাদিস’ বলে মন্তব্য করেছেন। (দেখুন : সিলসিলাতুল আহাদিসিস সাহিহাহ, ৩/১৩৫, হাদিস : ১১৪৪)

এই রাতে কবর জিয়ারত করা প্রসঙ্গেও কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। নবীজি (সা.) এই রাতে বাকি নামক কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৭৩৯, ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৩৮৯)

অতএব, কেউ চাইলে কবর জিয়ারতেও যেতে পারে। কিন্তু নবীজি এমনটি করেছেন বলে তাঁর সারা জীবনের একটি মাত্র রাতেরই বর্ণনা পাওয়া যায়। ফলে এটাকে নিয়মিত সুন্নত বা কর্মে পরিণত করার অবকাশ নেই। তা ছাড়া সংঘবদ্ধ হয়ে কিংবা নারী-পুরুষ একত্র হয়ে সম্মিলিত জিয়ারতেরও কোনো ধারণা সুন্নতে নববী অথবা সাহাবা ও তাবিয়িন থেকে মেলে না।

১৫ শাবান রোজা রাখার বিষয়েও কোনো কোনো বর্ণনায় উৎসাহিত করা হয়েছে। যদিও ওসব বর্ণনার সনদ নিয়ে হাদিস বিশেষজ্ঞদের কিছু কথা আছে, তথাপি ওই দিন সাধারণ নিয়ম ও নিয়তে কেউ রোজা রাখলে অসুবিধার কিছু নেই। অন্যদিকে এ বিষয়ক হাদিসগুলো মওজু বা একেবারেই ভিত্তিহীন এমন তো নয়। আর পূর্বোক্ত হাদিসগুলোর ভাষ্য মতে, নবীজি (সা.) শাবানের শেষ কিছুদিন ছাড়া বাকি সব দিনই রোজা নিজে রাখতেন এবং অন্যকে রাখতে অনুপ্রাণিত করেছেন।

আর প্রতি ইসলামী মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখার বিশেষ সওয়াবের কথা একাধিক সহিহ হাদিসে বিধৃত হয়েছে, যেগুলোকে ‘আইয়ামে বীয’-এর রোজা বলা হয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, প্রিয় নবী (সা.) আমাকে তিনটি জিনিসের অসিয়ত করে গেছেন। তার মধ্যে একটি হচ্ছে—প্রতি মাসের এই তিনটি রোজা রাখা। (বুখারি, হাদিস : ১১২৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৮২)

এই রাতে আমাদের করণীয় কী—এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনে রজব (রহ.) লিখেছেন, ‘মুমিনের কর্তব্য হলো, এ রাতে খালেস দিলে তাওবা করে জিকির, দোয়া ও ইস্তেগফারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাওয়া। যত্নের সঙ্গে নফল নামাজ পড়বে। কেননা কখন মৃত্যু এসে যায় বলা যায় না। তাই কল্যাণের মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই তার মূল্যায়ন করা জরুরি। আল্লাহর কাছ থেকে সওয়াব লাভের আশা নিয়ে ১৫ তারিখের রোজাও রাখবে। তবে অত্যন্ত জরুরি বিষয় হলো, ওই সব গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, যেগুলো এ রাতের সাধারণ ক্ষমা ও দোয়া কবুল হওয়া থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে দেয়। যথা—শিরক, হত্যা ও হিংসা-বিদ্বেষ। এ সবই কবিরা গুনাহ। আর হিংসা-বিদ্বেষ তো এতই গর্হিত বিষয় যে এটা বেশির ভাগ সময় মানুষকে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যেকোনো মুসলমান সম্পর্কেই বিদ্বেষ পোষণ করা অত্যন্ত মন্দ প্রবণতা। তবে সাহাবায়ে কেরাম ও সলফে সালেহিন সম্পর্কে অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষ বিদ্যমান থাকা অত্যন্ত ভয়াবহ ও গর্হিত অপরাধ। এ জন্য মুসলমানদের কর্তব্য হলো, সর্বদা অন্তরকে পরিষ্কার রাখা এবং হিংসা-বিদ্বেষ থেকে পাক-পবিত্র রাখা। বিশেষত উম্মাহর পূর্বসূরি ব্যক্তিদের সম্পর্কে অন্তর পুরোপুরি পরিষ্কার থাকা অপরিহার্য, যাতে রহমত ও মাগফিরাতের সাধারণ সময়গুলোতে বঞ্চিত না হতে হয়।’ (লাতাইফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা ২৬৫-২৬৬, দারু ইবনি কাসির, বয়রুত, ৫ম সংস্করণ, ১৯৯৯ খিস্টাব্দ)

লেখক : আলোচক, ইকরা টিভি, লন্ডন।

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: