আজ: ১৫ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার, ২রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৩রা রমজান, ১৪৪২ হিজরি, সকাল ৮:০৭
সর্বশেষ সংবাদ
সাহিত্য কথা ছিলো একটা পতাকা পেলে…..

কথা ছিলো একটা পতাকা পেলে…..


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ০৩/০৫/২০১৪ , ১১:১০ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: সাহিত্য


তারিখঃ ৫ এপ্রিল ,১৯৭১

সময়ঃ ভোর ৬টা

স্থানঃ খুলনা শহরের একপ্রান্তে ছোট্ট একটি বাড়ি ।

মিলি আর হাসান বারান্দায় এসে দাঁড়াল । পেছনে হাসানের বোন রেনু দাঁড়িয়ে আছে । ওড়নায় চোখের পানি মুছছে । তার ভাই আজ চলে যাবে , যুদ্ধের ট্রেনিং নেবে । সারাদেশে এখন যুদ্ধের ডাক । সেই ডাক উপেক্ষা করার শক্তি হাসানের নেই । তাকে যেতেই হবে । এই মুহূর্তে মিলির গর্ভে তার যে শিশুটি বড় হচ্ছে তার ডাক উপেক্ষা করেই যেতে হবে হাসানকে । মিলির স্বল্প স্ফিত পেটে আলতো করে হাত রাখে হাসান । ফিসফিস করে বলে , “আমি যাচ্ছি , কথা দিলাম আমি ফিরে আসব ,তোমার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা হাতে আমি ফিরে আসব । ” মিলি চোখের পানি সামলানোর চেষ্টা করে । সে ঠিক করেছে হাসানকে হাসিমুখে বিদায় দেবে ।

যেদিন হাসান মাঝরাতে হঠাৎ মিলিকে ঘুম থেকে তুলে বলল , সে যুদ্ধে যাবে , মিলি খামচে ধরেছিল হাসানের বুকে । চোখ ফেটে কান্না বেরোচ্ছিল তার। “আমাকে এই অবস্থায় রেখে তুমি যুদ্ধ করতে যাবে ?”

“দেশের প্রতি আমার কি কোন দায়িত্ব নেই মিলি ? আজ সবাই যখন দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে আমি কাপুরুষের মত বসে থাকব ? তুমিই বল …”

“দেশের প্রতি দায়িত্ব আছে তোমার । আর আমার প্রতি , আমার গর্ভের সন্তানের প্রতি , তোমার বাবা আর বোনের প্রতি ?”

“ মিলি , আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি , আমাদের অনাগত সন্তানকেও ভালবাসি , আমার পরিবারকে ভালবাসি । কিন্তু আমি আমার দেশকেও ভালবাসি । আমার সন্তান এই পরাধীন দেশে মাথা নিচু করে বেঁচে থাকবে তা কি হয় ? আমার সন্তান বড় হবে স্বাধীন বাংলাদেশে । মাথা উঁচু করে বাঁচবে সে । আর আমার পরিবারকে তুমি জীবন দিয়ে আগলে রাখবে আমি জানি । তোমাকে এতটা ভরসা করতে পারি বলেই তো আমি নিশ্চিন্তে যেতে পারব । ” মিলি কিছুই বলতে পারেনা । শুধু তপ্ত কিছু ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে ।

“তুমি দেখো মিলি , আমি ঠিক দেশ স্বাধীন করে আবার ফিরে আসব । সেদিনও তোমার চোখে অশ্রু থাকবে । কিন্তু সেটা খুশির অশ্রু । ”

বহুদিন ধরে প্যারালাইসড হয়ে বিছানায় পড়ে আছে হাসানের বাবা মবিনুর রহমান। হাসান তাকে সালাম করতে গেলে তিনি শুধু শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন ।

“বাবা দোয়া করো , আমি মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছি ।”  মবিনুর রহমান সাহেবের চোখ দুটো ছলছল করে । তিনি কাউকে বোঝাতে পারেননি তার কতটা খুশী লাগছিল । প্রতিদিন স্বাধীন বাংলা বেতার শোনেন তিনি । ঠিক সন্ধ্যায় রেনু এসে রেডিও ছেড়ে দিয়ে যায় । তিনি কান পেতে শোনেন । ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন দীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন , “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম , এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ” , তখন মবিনুরের অচল দেহ দিয়েও এক অদ্ভুত শিহরন বয়ে যায় । এরপর মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন । শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ । রেডিওতে মর্টার গানের শব্দে মবিনুরের সমস্ত শরীর ঝনঝন করে । যদি তাঁর দেহটা অচল না হত , তিনিও যেতেন ছেলের সাথে ।বাপ ছেলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করত । মনে মনে ছেলের জন্য প্রান ভরে দোয়া করেন তিনি। হাসান দোয়া নিয়ে চলে যায় । মবিনুর রহমান মনে মনে বিড়বিড় করেন , এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম , এবারের সংগ্রাম …………

রেনু ছুটে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরে । চোখের জলে শার্ট ভিজে যায় হাসানের । “তুমি যেওনা ভাইয়া । আমাদেরকে ফেলে , ভাবিকে এই অবস্থায় রেখে তুমি যেওনা ।”

“ধুর পাগলী । তুই আছিসনা ? পারবিনা তোর ভাবির খেয়াল রাখতে ? খুব তো বড়াই করে বলিস যে বড় হয়ে গেছিস , আর পিচ্চি মেয়ের মত ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছিস ! দেখ , আমার শার্ট ভিজিয়ে কি করেছিস ।”

রেনু ভাইকে ছেড়ে মিলির কাছে দৌড়ে আসে । “ভাবি তুমি আটকাও ভাইয়াকে । তুমি কিছু বল ।”

“আমি যদি আজ তোমার ভাইকে আটকাই তবে আমার দেশের সাথে বেঈমানি করা হবে । তুমি চিন্তা করোনা রেনু , তোমার ভাইয়া আমার সন্তানকে কথা দিয়েছে সে ফিরে আসবে । লাল সবুজ পতাকা হাতে ।”

হাসান ঘরের বাইরে পা রাখে । পেছন ফিরে মিলির দিকে তাকায় । মিলি চোখ ফিরিয়ে নেয় । ওর প্রচণ্ড ইচ্ছে হচ্ছে দৌড়ে গিয়ে হাসানকে জাপটে ধরে বলে , “তুমি কোথাও যেতে পারবেনা আমাকে ছেড়ে ।” কিন্তু না , এতটা স্বার্থপর সে হতে পারবেনা ।

তারিখঃ ২৯ এপ্রিল ১৯৭১

সময়ঃ বিকেল ৪টা

স্থানঃ রেনুদের বাসার পাশের পুকুর পাড় ।

রেনু আর রঞ্জু বসে আছে পানিতে পা ডুবিয়ে । রেনুর মুখ হাসি হাসি ।

“জানো রঞ্জু , আমার মনে হয় ভাবির ছেলে হবে ।”

“তাই ? কিভাবে বুঝলে ?”

“আমি স্বপ্নে দেখেছি । ঠিক ভাইয়ার মত দেখতে একটা শিশু পতাকা নিয়ে খেলা করছে ভাইয়ার কোলে ।”

“জানো রেনু , আমারও ইচ্ছা করে হাসান ভাইয়ের মত যুদ্ধে যেতে । ”

শুনেই আঁতকে ওঠে রেনু । রঞ্জুর হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে । “খবরদার , ও কথা বলবেনা । দিনরাত এখন শুধু ভাইয়াকে নিয়েই চিন্তা হয় । আজ প্রায় এক সপ্তাহ হতে চলল ভাইয়ার কোন চিঠি আসেনি । তুমিও যদি এমন কর , আমি কিন্তু জান দিয়ে দেব সতি সত্যি ।”

রঞ্জু হো হো করে হেসে ওঠে ,“আমার জন্য জান দিয়ে দেবে ? দাও তো দেখি সোনাপাখি । দেখি তোমার কত্ত সাহস”

“আমার ভালবাসা নিয়ে সন্দেহ আছে তোমার ? ঠিক আছে , দিলাম কিন্তু ঝাপ পানিতে ।” রেনু উঠে দাঁড়াতেই রঞ্জু হাত ধরে টেনে বসিয়ে দেয় ওকে ।

“ঠিক আছে , তুমি পাশ । ১০০ তে ৯৯ ।”

“৯৯ কেন ?”

“কারন আমি তোমাকে আরও বেশী ভালবাসি । আমি হলাম ১০০ তে ১০০।”

দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে আবার । ঠিক এমন সময় দূরে গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যায় । কিছু মানুষ দৌড়ে আসছে । তাদের চেহারায় আতঙ্ক । অস্ফুত ভাবে কানে আসে তাদের কথা , “মিলিটারি আসছে , মিলিটারি ……”

দৌড়ে চলে রেনু রঞ্জুর হাত ধরে । গলিটা পার হলেই রেনুদের বাসা । তার পাশেই রঞ্জুদের । দুজনে লোকচক্ষুর আড়ালে ঢুকে পড়ে যার যার বাড়িতে । মিলি বারান্দার সিঁড়িতেই বসে ছিল । হুড়মুড় করে গেট খুলে ঢুকল রেনু ।

“ভাবি আমাদের এলাকায় মিলিটারি এসেছে । ”

“কি বলছ এসব ? তুমি দেখেছ ?”

“হ্যা ভাবি , আমি তো নিলুদের বাড়ি গিয়েছিলাম । গোলাগুলির শব্দে দৌড়ে এলাম । ” হাঁপাতে হাঁপাতেই মিথ্যে করে বলে রেনু । রঞ্জুর সাথে ওকে নিয়ে ভাবি এমনিতেই সন্দেহ করে । ভয় পায় রেনু ভাবিকে ।

“ঠিক আছে , তুমি ভেতরে যাও । আমি দেখছি ।”

“তুমিও চল ভাবি , আমার খুব ভয় করছে ।”

সেদিন অল্পের জন্য বেঁচে যায় মিলিরা । পাক সেনারা আশেপাশের অনেক বাড়িতেই হামলা চালায় । শেষমেশ রঞ্জুদের বাসায় গিয়ে ওঠে । রঞ্জুর বাবা হোসেন সাহেবের সাথে তাদের কি যেন কথা হয় । হোসেন সাহেব তাদের অনেক আপ্যায়ন করে বলে শোনা যায় । তারপর তারা ফিরে যায় ।

তারিখঃ ১৫ মে ১৯৭১

সময়ঃ রাত সাড়ে আটটা

স্থানঃ মিলিদের খাবার ঘর।

রেনু আর মিলি খেতে বসেছে ।

“খবর জানো রেনু ? পাশের বাড়ির হোসেন চাচা নাকি শান্তি কমিটিতে যোগ দিয়েছেন ।”

শুনে গলায় ভাত আটকে যায় রেনুর । “হোসেন চাচা ? মানে রঞ্জুর বাবা ?”চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করে রেনু ।

“হুম , সারা এলাকায় এই নিয়েই তো কানাঘুষা চলছে । অনেকে অবশ্য খুশিও হয়েছে । শান্তি কমিটির লোক থাকলে নাকি ওই এলাকায় মিলিটারিরা তেমন কিছু করেনা ।”

“কিন্তু ভাবি , রঞ্জু যে বলল ও মুক্তিযুদ্ধে যেতে চায় ……”

“রঞ্জুর সাথে তোমার কখন এসব কথা হল ?”

ভাবির জেরায় পড়ে অসহায় হয়ে যায় রেনু । “না মানে অনেক আগে শুনেছিলাম । ভাবি , ভাইয়ার কোন চিঠি এসেছে ?”

মিলি একথা শুনেই উদাস হয়ে যায় । হাসানের কোন চিঠি আসেনি । দিন দশেক আগে হাসানের বন্ধু মিজান ফোন করে বলেছিল , হাসান নাকি ইন্ডিয়া থেকে ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফিরেছে । এরপর আর কোন খবর নেই । কেমন আছে হাসান ? মিলি খাবার ছেড়ে উঠে যায় । রেনু ডাক দেয় তাকে ,“ভাবি , চিন্তা করোনা , ভাইয়া ভাল আছে । আমার মন বলছে ।”

রাতে ঘুম আসেনা কারোই । দেশের অবস্থা খুবই খারাপ বলে সবাই সন্ধ্যা হতে না হতেই বাতি নিভিয়ে দেয় । অনেকে ঘুমিয়ে পড়ে , অনেকে রেডিও শোনে । চারিদিকে থাকে আঁধার আর ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ । বারান্দায় এসে বসে মিলি আর রেনু । আকাশে আজ ভরা জ্যোৎস্না । চাঁদটা ঠিক রুপোর থালার মত । ঠিকরে বের হচ্ছে আলো । মিলি রেনুকে বলে ,

“রেনু , গান ধর তো একটা । কতদিন তোমার গান শুনিনা ! ”

“কোন গানটা ভাবি ?  ”

“ওইযে , তোমার ভাইয়া সবসময় শুনতে চাইত যে রবীন্দ্রসঙ্গীতটা …”

রেনু কিন্নর কণ্ঠে গান ধরে – “আমার প্রানের প’রে চলে গেল কে , বসন্তের বাতাসটুকুর মত … সে যে ছুঁয়ে গেল নুয়ে গেল রে , ফুল ফুটিয়ে গেল শত শত ।”

ভেতরের ঘরে শুয়ে শুয়ে মবিনুর রহমানের চোখ ভিজে ওঠে । মেয়েটা তার কি অপূর্ব করে গাইছে । জানলা দিয়ে জ্যোৎস্না এসে পড়েছে তার খাটে । তিনি হাত বাড়িয়ে ধরতে পারেন না । আহা !

তারিখঃ ২৫ আগস্ট ১৯৭১

প্রিয় হাসান ,

বিয়ের আগের মত করে তোমাকে প্রিয় ডাকলাম । তুমি কোথায় আছ কেমন আছ , আমি জানিনা । তোমার কোন খবর পাইনি । কিন্তু আমার মন বলছে তুমি ভাল আছ । দেশের জন্য প্রানপনে লড়াই করছ । আমি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই , কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে , পতাকা হাতে নিয়ে তুমি দৌড়ে আসছ । জয় বাংলা বলে আকাশ বাতাশ কাঁপিয়ে তুমি আসছ । কি যে সুন্দর লাগছে তোমাকে ! ঠিক এভাবেই এসো তুমি । আমি আর আমার বাবুটা অপেক্ষা করছি তোমার জন্য । আমাদের বাবুটাও তোমার জন্য অস্থির হয়ে আছে । আমার ভেতর তার নাড়াচাড়া দেখে আমি টের পাই সেটা । ওর হাতে পতাকা তুলে দিতে হবে ,মনে আছে তো ? কিছুদিন আগে মিজান ভাই ফোন করে বলল , কোথায় নাকি তোমার মত দেখতে একটা লাশ পড়ে ছিল । তিনি ক্ষতবিক্ষত লাশটা দেখে চিনতে পারছেননা লাশটা তোমার নাকি অন্য কারো । আমি তাঁকে আশ্বস্ত করেছি , সেটা তুমি নও । তুমি কি করে লাশ হবে ? তুমি তো কথা দিয়েছ , তুমি ফিরে আসবে । আমি জানি তুমি কথা রাখবে । দেশ স্বাধীন করে তুমি ফিরে আসবে । বাবা , রেনু – ওরা সবাই ভাল আছে । রেণুটা তোমার জন্য কাঁদে প্রায়ই । এখনও বাচ্চাই রয়ে গেছে মেয়েটা । পাশের বাসার রঞ্জু আছেনা ? রেনু মনে হয় রঞ্জুকে ভালবাসে । যদিও আমাকে কিছু বলেনি , আমি বুঝতে পারি । জানো , রঞ্জুর বাবা শান্তি কমিটিতে যোগ দিয়েছে । সেদিন সাত সকালে হঠাৎ আমাদের বাসায় হাজির । ভাব দেখাল আমাদের খোঁজ নিতে এসেছে । কিন্তু তার মতিগতি আমার একদম ভাল লাগেনি । তুমি কোথায় আছ আমি জানি কিনা বারবার জিজ্ঞেস করল । তাকে আমি কিছুই বলিনি । বলব কি ! আমি তো নিজেই জানিনা তুমি কোথায় আছ , কেমন আছ ! তুমি যেখানেই থাকো , প্রাণপণে যুদ্ধ করে যাও । কক্ষনো পিছু হটবেনা । ওই শকুনের দলকে আমাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দাও । এদিকটা আমি সামলাবো । বাবা , রেনু আর আমাদের বাবু ভাল থাকবে আমার কাছে । তুমি একদম ভেবনা । আমি কত শক্ত মেয়ে তুমি তো জানো । হোসেন চাচা সেদিন আসার পর আমি রেনুকে আর বের হতে দেইনা । আমরা সাবধানে থাকব । তুমিও সাবধানে থেকো । ভাল থেকো । আমরা অপেক্ষা করছি তোমার জন্য , অপেক্ষা করছি স্বাধীনতার । জয় বাংলা ।

তোমার মিলি ।

পুনশ্চ – আমার সোনার বাংলা , এর পরের লাইনটা যেন কি ?

চিঠিটা মিলির বালিশের নীচে চাপা পড়ে থাকে দিনের পর দিন ।

তারিখঃ ২১ অক্টোবর ১৯৭১

সময়ঃ দুপুর ১২টা

স্থানঃ রঞ্জুদের বাসা ।

ভরদুপুরে বুটের আওয়াজ তুলে এক ঝাঁক মিলিটারি এসে থামল রঞ্জুদের বাসার সামনে । হোসেন সাহেব দৌড়ে এলেন দাঁত কেলিয়ে । হাত কচলাতে কচলাতে বললেন ,

“আইয়ে আইয়ে সাহাব । ইস গারিব কি ঘারমে তাসরিফ লিজিয়ে ।”

মিলিটারিদের কমান্ডার মেজর মোশ্তাক এগিয়ে এল ।

“হাম বেঠনে নেয়ি আয়া। তুমি বলেছ তুমার এলাকায় মুক্তি আছে । কাহা হে উস্কা ঘার ?”

হোসেন সাহেব মিলিটারির দলটাকে নিয়ে এলেন তাদের ঘরের উলটো দিকের গেটটাতে । “ইয়েহি হে মেজর সাহাব । এই বাড়ির ছেলেই মুক্তি হইছে । ”

তার কথা শেষ হবার আগেই ধুমাধুম লাথি পরতে থাকে গেটে । রানু দৌড়ে আসে মিলির রুমে । মিলির পেটে তখন আট মাসের শিশু । “ভাবি , তুমি লুকোও জলদি । আমি দেখছি ওদের ।”

“না রেনু , তোমার কিছু হলে হাসান আমাকে ক্ষমা করবেনা । আমি দেখছি , তুমি ভয় পেওনা ।”

“না ভাবি , তোমার আর তোমার বাচ্চার কিছু হলে আমি ভাইয়াকে মুখ দেখাতে পারবনা । প্লীজ ভাবি , তোমার সন্তানের কথা চিন্তা করে হলেও জেদ করোনা । পিছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে কুয়াতলার পিছনে গিয়ে লুকিয়ে থাকো ,যাও জলদি । ওরা দরজা ভেঙ্গে ঢুকে পড়বে ।”

রেনুর কথা শেষ হবার আগেই ধরাম করে ভেঙ্গে পড়ল উঠোনের গেট । মিলিটারিদের বুটের আঘাত এবার দরজায় ।

“যাও ভাবি যাও …”

“নাহ , তোমাকে না নিয়ে আমি যাবনা ।”

“কাউকে না পেলে ওরা ঠিকই পেছনের দরজা খুঁজে বের করবে । আমি ওদের আটকাচ্ছি । তুমি যাও ।”

মিলিকে ঠেলে পিছনের দরজা দিয়ে বের করে দিল রেনু । সঙ্গে সঙ্গেই দরজা ভেঙ্গে প্রায় গোটা দশেক মিলিটারি ঢুকে পরল ঘরে । প্রথমেই ওদের চোখ পরল মবিনুর রহমান এর ঘরে । “ ইয়াহা তো এক বুদ্ধা হ্যায় ।”

“ উসকো ছোড় । হামনে লারকি কা আওয়াজ শুনা । লারকি কাহা ?”

রেনু তখন রান্না ঘরে বটি খুঁজছে । চুলার পাশ ঠেকে বটি তোলার আগেই ওর চুল ধরে হ্যাঁচকা টান মারল এক হানাদার । টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসল উঠোনের মাঝে । মেজর মোস্তাক সেখানে চেয়ার পেতে বসেছে । রেনুকে দেখেই তার চোখ চকচক করে উঠল। “লারকি তো বহুত খুবসুরাত হ্যায় ।”  তার কথা শুনে হেসে উঠল বাকিরা । ওদের অট্টহাসিতে মাথা ঘুরতে লাগল রেনুর । একজন তার হাত পিছমোড়া করে ধরে রেখেছে ।

“তেরা ঘারমে মুক্তি হ্যায় ? ” রেনুকে প্রশ্ন করল মেজর । ক্রোধের আগুনে তখন রেনুর শরীর টগবগ করে ফুটছে । লাথি মেরে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মিলিটারিকে ফেলে দিল সে । অমনি চারদিক থেকে সব পাকসেনা বন্দুক উঁচিয়ে ঘিরে ধরল তাকে । তাদেরকে থামিয়ে দিল মেজর মোস্তাক, “ রুকো, ইস লারকি কা তো বহুত গুসসা । পেহলে ইসকা গুসসা কাম কারতেহে । চালো ,ইসকো থোরা পেয়ার কারতে হ্যায় । ” কোমরের বেল্ট খুলতে খুলতে এগিয়ে এল মেজর । তিনি রাজা , তাই তিনি প্রথমে ভোগ করবেন । তারপর সেই উচ্ছিষ্ট পালাক্রমে ভোগ করবে তার সাগরেদরা ।

মুবিনুর রহমানের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । নিজের মেয়ের এই ভয়ঙ্কর আর্তচিৎকার শোনার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল । কিন্তু নিজেকে মারার ক্ষমতাও আল্লাহ তাঁকে দেননি । মুবিনুর মনে মনে চিৎকার করছে , ইয়া মাবুদ , তুমি আমার মেয়েকে বাঁচাও । আমার মেয়েকে বাঁচাও আল্লাহ ।

শেষ সৈন্যটা যখন রেনুর নগ্ন দেহটাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল , উঠোনে তখন রক্তস্রোতের ধারা বইছে । মেজর মোস্তাক আবার ভাল করে দেখল নিথর রেনুকে । বন্দুকের বেয়নেট দিয়ে খোঁচাতে লাগল রেনুর বুকে , পেটে , আরও নিচে … ।

“ লারকি বহুত খুবসুরাত হ্যায় । হাহাহাহা ।” অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল মেজর আর তার সৈন্যরা আবার।

রঞ্জু তখন জসীম ভাইয়ের চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছে । ওর হাতে কাগজে মোড়ানো কিছু কাঁচের চুড়ি । লাল আর সবুজ রঙের । যেদিন দেশ স্বাধীন হবে সেদিন রেনুর হাতে এগুলো পরিয়ে দিবে রঞ্জু । তারপর দুজন মিলে পতাকা লাগানো রিকশায় করে সারা খুলনা শহর ঘুরবে । স্বাধীন দেশে মুক্ত স্বাধীন পাখির মত উড়বে । তখনই পাড়ার এক ছেলে দৌড়ে এসে বলে , “রঞ্জু ভাই,রেনু আপাদের বাসায় আপনের বাবা মিলিটারি পাঠাইসে । জলদি যান ।”

মাথায় আগুন ধরে যায় রঞ্জুর । দোকান থেকে বড় দা টা নিয়ে রাস্তায় বের হয় । ছুটতে থাকে বেহুশের মত । রঞ্জু যখন রেনুদের উঠোনে পা রাখে চারিদিকে তখন খা খা নিরবতা । একটি শকুন পাচিলের উপর বসে অপলক তাকিয়ে আছে রক্তের দিকে । রক্তে মাখা রেনুর দিকে একবার শুধু তাকায় রঞ্জু । সেদিকে না গিয়ে আগে উল্টো দিকে ছুটে সে । আজ তার মাথায় খুন চেপেছে । দা নিয়ে ছুটে চলে সে তার দেশদ্রোহী পিতাকে হত্যা করার জন্য । কিন্তু না , তার আগেই পালিয়ে যায় রাজাকার হোসেন । তাকে খুঁজে পাওয়া যায়না কোথাও । রেনুকে মাটি দিয়ে শপথ করে রঞ্জু , এর বদলা সে নেবেই । যুদ্ধে চলে যায় সেও ।

তারিখঃ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১

সময়ঃ সকাল ৯টা

স্থানঃ রেনুদের বাসা ।

রঞ্জু দৌড়ে এসে ঢুকল মুবিনুর রহমানের ঘরে ।

“চাচা শুনছেন নাকি , দেশ স্বাধীন হয়েছে । জয় বাংলা ।” একহাত উঁচিয়ে স্লোগান দেয় রঞ্জু । রঞ্জু যুদ্ধে তার এক হাত হারিয়ে ঘরে ফিরেছে ক’দিন হল । শুনেছে তার বাবা নাকি পাকিস্তান পালিয়ে গেছে মুক্তিবাহিনীর ভয়ে । মিলিদের সব দেখাশোনা এখন রঞ্জুই করে । ঠিক রেনুর মত করেই আগলে রাখে রেনুর পরিবারকে । আর প্রতিদিন মনে মনে শপথ করে , ওর রেনুকে এত কষ্ট দিয়ে মারার পেছনে যে লোকটা দায়ি তার প্রতিশোধ না নিয়ে সে মরবেনা । চোখ বন্ধ করলেই রেনুর রক্ত মাখা মুখটা ভেসে ওঠে সামনে । জন্মভুমির ঋণ , ভালবাসার ঋণ তাকে শোধ করতেই হবে ।

মুবিনুরের গায়ে এসে পড়া রোদটা কেমন কড়কড় করে । যেন নতুন কোন তাজা সূর্য । মনে মনে বলতে থাকেন তিনি ,“জয় বাংলা জয় বাংলা …”

তার ঘর থেকে বের হয়েই রঞ্জু ছুটে যেতে থাকে মিলির ঘরে । “ভাবি , দেশ স্বাধীন হয়েছে ভাবি । আমাদের বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ।” মিলির ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ায় রঞ্জু । মিলি খাটে শুয়ে আছে , সারা বিছানা রক্তে মাখামাখি । কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে পেট চেপে ধরে চিৎকার করে মিলি ,“রঞ্জু একটা ডাক্তার আনো । আমার বাচ্চাটা …… ” ব্যাথায় নীল হয়ে যায় মিলি । রঞ্জু দিগ্বিদিক দৌড়ে কিভাবে যে ডাক্তার নিয়ে এল সে নিজেও জানেনা । মিলির চেতনা প্রায় নেই বললেই চলে । ডাক্তার বলছে প্রেশার দিতে , কিন্তু মিলির সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে । হাসান , কোথায় হাসান ? দেশ তো স্বাধীন হয়েছে ।হাসান কি কথা রাখবেনা ?

মুবিনুর রহমানের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অত্যন্ত তীক্ষ্ণ । তিনি কান পেতে আছেন কখন নবজাতকের কান্নার আওয়াজ শোনা যায় । এইতো শোনা যাচ্ছে , সদ্য জন্ম নেয়া তার নাতি কাঁদছে । “ছেলে হয়েছে , ছেলে … “ রঞ্জু দৌড়ে গেল ভেতরে । হঠাৎ মুবিনুর রহমানের মনে হল উঠোনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে । ওইতো , পায়ের আওয়াজ টের পাওয়া যাচ্ছে। এই পায়ের আওয়াজ তার অনেক আপন।

উঠোনে যে এসে দাঁড়িয়েছে তার গাল ভর্তি দাড়ি , মাথায় বড় বড় চুল , কাঁধে রাইফেল আর হাতে পতাকা । লাল সবুজের পতাকা । হাসান তার কথা রেখেছে ।

তারিখঃ ১২ ডিসেম্বর ২০১৩

সময়ঃ সকাল ১০টা

স্থানঃ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল প্রাঙ্গন , ঢাকা

ভবনের সামনে বিশাল জটলা । অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধারা এখানে এসে জড়ো হয়েছে । তাদের হাতে বাংলাদেশের পতাকা । স্লোগানে স্লোগানে আকাশ বাতাশ মুখরিত । আজ এক রাজাকারের রায় হবে । সেই ভিড়ে হাসান আর মিলি রঞ্জুর জন্য অপেক্ষা করছে । সাথে আছে ওদের একমাত্র ছেলে বিজয় , বিজয়ের মেয়ে মুক্তি । মুক্তির হাতে একটা প্ল্যাকার্ড । ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছে সে । একাত্তরে ওর দাদুর বোন সহ আরও লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করতে সাহায্য করেছে যে বিশ্বাসঘাতক দেশদ্রোহীগুলো তাদের সবার ফাঁসি চায় সে ।

কিছুদিন আগেই লন্ডনে পলাতক থাকা ৯০ বছর বয়সী রাজাকার হোসেনকে দেশে নিয়ে আসা হয় বিশেষ ব্যাবস্থায় । আজ তার রায় দিয়েছে আদালত । তার বিরুদ্ধে সাক্ষি দিয়েছে তারই ছেলে মুক্তিযোদ্ধা রঞ্জু । সেই সাক্ষ্যতে ফাঁসির রায় হয়েছে তার । আদালতের কার্যক্রম শেষ হল । উল্লাসে ফেটে পড়ল গোটা দেশ । এবারের বিজয় দিবসের শ্রেষ্ঠ উপহার পেয়েছে দেশ ।

রঞ্জু ভিড় ঠেলে ধীর পায়ে এগিয়ে এল ওদের কাছে । এক হাতে জড়িয়ে ধরল হাসানকে । আজ হাসানের বোনের সম্ভ্রমহানির বিচার হয়েছে । তাকে নৃশংসভাবে হত্যার বিচার হয়েছে । একটা দেশদ্রোহী কুলাঙ্গারের ফাঁসির রায় হয়েছে ।

রঞ্জু প্রান ভরে নিঃশ্বাস নেয় । ৪২ বছর পর আজ সে প্রতিশোধ নিতে পেরেছে । পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা কাগজে মোড়ানো কিছু কাঁচের চুড়ি বের করে রঞ্জু । লাল আর সবুজ রঙের । বিজয়ের মেয়ে মুক্তিকে দেয় চুড়িগুলো । বলে , “ রেনু নিজের জীবন দিয়ে তোমার দাদী আর বাবাকে রক্ষা করেছিল । আমি ভেবেছিলাম দেশ স্বাধীন হলে রেনু আর আমি রিকশা করে ঘুরব । ওর হাতে থাকবে এই লাল সবুজ চুড়ি । আমি রেনুকে স্বাধীন বাংলা দেখাতে পারিনি । আজ তুমি এই লাল সবুজের চুড়ি হাতে পড়ে সারা শহর ঘুরে বেড়াও । আজ আর আমার কোন দুঃখ নেই । আমি আমার কথা রেখেছি । আমার দেশের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছি ।”

দূরে কোথাও অনুষ্ঠান হচ্ছে । জাতীয় সঙ্গীত বাজছে । হাসান , মিলি , রঞ্জু , বিজয় , মুক্তি …… ওরা মুগ্ধ হয়ে শুনছে ।

“কি শোভা কি ছায়াগো , কি স্নেহ কি মায়াগো … কি আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে নদীর কুলে কুলে … ”

আজ ওদের মনে অনেক আনন্দ । কিন্তু চোখে অশ্রু , বিজয়ের অশ্রু ।

 

লিখেছেনঃ সাকিব হাসান

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: