আজ: ২৬শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার, ১০ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি, বিকাল ৪:৫০
সর্বশেষ সংবাদ
সাহিত্য রাজীব চৌধুরীর লেখা : এবং একাত্তর

রাজীব চৌধুরীর লেখা : এবং একাত্তর


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ০৩/০৫/২০১৪ , ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: সাহিত্য


প্রিয় পাঠক- আপনাকে যেতে হবে চারহাজার বছর পুর্বে কিনবা সাতান্ন পুরুষ পুর্বের এক সময়ের সমতট অঞ্চলে। একটা আগুনের কুন্ডলীর সামনে বসে বসে কাঁদছে নিনিখ। আগামীকাল তার তীর ছোড়া পরীক্ষা। কিন্তু সে কোনভাবে টাং ধরে রাখতে পারছেনা। আবার কুক্কুর ছুড়ে মারার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিল বলে ওকে শাস্তি পেতে হয়েছিল ওর বাবার কাছে। নিনিখ হল খুমেন জাতীর নেতা নুখেন খুমেন এর একমাত্র সন্তান। সন্তান হলেও অনেকেই সন্দেহ করে নিনিখ নুখেন খুমেন এর সন্তান নয়। ছোট বেলা তাকে খুঁজে পেয়েছিল বলে অনেকেই কানাঘুষা করে। তবে সামনা সামনি কিছু বলতে পারেনা কেউ। অন্তত নিনিখের ১৪ বছরের জীবনে কেউ ওর দিকে চোখ তুলে কথা বলেনি। এমনকি ওর বাবার বিরুদ্ধেও কেউ কথা বলেনি।

কিন্তু আজকে সবাই একজোট হয়েছে। খুমেন জাতীর পুরুষ হবার পরীক্ষায় যদি নিনিখ না টিকতে পারে তবে তাকে ছেড়ে যেতে হবে খুমেন দের। খুমেনদের জাতে কোন কাপুরুষের স্থান নেই। ওদের যুদ্ধ করে টিকতে হয়। বুদ্ধি থাকলেই হয়না। যে কোন সময় ওদের আক্রমন করতে পারে ক্যাফু প্রজাতি। নিজেদের ওরা মহান বলে দাবি করে এবং মাঝে মাঝেই আক্রমন করে বসে শান্তি প্রিয় কিফু- খুমেন- তিতিট জাতির উপর। আর ধরে নিয়ে যায় শক্তিমান পুরুষদের। মেরে ফেলে বয়োবৃদ্ধদের। মহিলাদের নিয়ে যায় নিজেদের যৌনসাথী করার উদ্দেশ্যে। দাস বানিয়ে রাখে- আর দিনে রাতে অত্যাচার করে। তাই নিনিখকেও পুরুষ হবার পরীক্ষায় উত্তীর্ন হতে হবে। নতুবা ছেড়ে যেতে হবে খুমেন জাতকে। চলে যেতে হবে ওদের সাজানো গোছানো গ্রাম ফেলে। সুন্দর বয়ে চলা নদী ফেলে। নদীর তীরের সবুজ বৃক্ষ ছেড়ে। নিনিখ মেনে নিতে পারেনা। কারন সে খানিকটা দুর্বল। অন্য খুমেন দের সন্তান দের মত করে সে যুদ্ধ করতে পারেনা। কালো চামড়া আর লাল চামড়ার পশুদের পেটাতে পারেনা। নিজের হাতে ঘাস খাইয়ে নিয়ে যেতে পারেনা বনের গহীনে। সেখানে ওর অনেক ভয় লাগে।

একা একা আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তার মাকে খুঁজতে থাকে নিনিখ। ঝিন ঝিন করা পোকা গুলো একটানা ডেকে চলে। নিনিখের বেশ ভালো লাগে। নিনিখের গান গাওয়ার খুব শখ। সে মনে মনে গান গাইতে থাকলে সবাই অবাক হয়ে শুনতে থাকে। কিন্তু নিনিখের গান গাওয়াই ওর পুরুষ হবার পরীক্ষা নয়। পুরুষ হবার পরীক্ষায় তাকে অনেক কঠিন কঠিন স্তরে নিজেকে প্রমান করতে হবে। নিনিখ সেই সব কঠিন নিয়ম গুলো কোন সময়েই পারেনি। তাকে একটা পাথর ছুঁড়তে দিলে সে পাথর সহ মাটিতে পড়ে গিয়ে গড়াগড়ি করে। সবাই হাসাহাসি শুরু করে তাকে এ অবস্থায় দেখে। কুক্কুর ( ধারালো তীর) ছুঁড়ে মারার পরীক্ষায় সে কোন ভাবেই একটা নিরীহ কালো পশমের প্রানীকে(ছাগল) হত্যা করতে পারেনা। টাং(ধনুকের রশি) ধরে রেখে দুই আঙ্গুলে টেনে ধরার শক্তি তার শরীরে আছে। তবে তার ইচ্ছে করেনা। সে শুধুই মনে মনে গুন গুন করে গান বানায়। গান গেয়ে গেয়ে আকাশ দেখে। তার এই সব দেখে তার বাবা যারপরনাই বিরক্ত। নিজের সন্তানকে গোত্রের প্রধান করতে চায় নুখেন। কিন্তু সন্তানের কোন যোগ্যতাই নেই। এজন্য তিনি খানিক আগে নিনিখ কে অনেক ভৎসনা করেছেন। এতে নিনিখের বেশ মন খারাপ হয়েছে। তারপর থেকে সে তার প্রিয় একটা স্থানে একা একা বসে বসে আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে আছে।

” কি করছিস বাবা?” পেছন থেকে গমগম করে বলে ওঠে একটা কন্ঠস্বর।
নিনিখ এই স্বর বেশ ভালোভাবেই চেনে। কিন্তু সে কোন উত্তর দেয়না। তার সামনে এসে দাঁড়ায় মোটা সোটা চেহারার নুখেন খুমেন- নিনিখের বাবা।
নুখেন বলে ওঠে- ” আগামীকালের পরীক্ষার উপর আমার মান সম্মান জড়িয়ে আছে”
“আমি জানি বাবা” বলে চুপ করে থাকে নিনিখ।
“তোকে অনেক বার বলেছি তুই যেন একবার টাং ধরা শিখিস। এখন কালকের পরীক্ষায় যদি টিকতে না পারিস জুবমুর ছেলের সাথে তাহলে সেই হয়ে যাবে গোত্র প্রধান। আমাদের পরিবারের মান সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে নিনিখ।”
“আমি জানি বাবা”
“তো এখন এভাবে বসে না থেকে একটু টাং ধরা শিখলে ও তো পারিস”
“আমার ইচ্ছে করেনা”
“কেন?”
“আমার খুন করতে ভাল লাগেনা। লাল লাল মং(রক্ত) দেখলে আমার ভয় লাগে।”
“কিন্তু ক্যাফুরা যখন আমাদের আক্রমন করবে তখন তো তাদের সমুচিত শিক্ষা দিয়ে হবে নিনিখ।”
“আমার এতো কিছু ভালোলাগেনা- আমার শুধু গোং (গান) গাইতে ইচ্ছে করে। সুর মিলিয়ে (গোং)গান বানাতে ইচ্ছে করে”
” ঠিক আছে। কিন্তু শিকার না করলে আমরা খাবো কি?”
” কেন? আমরা সুন্দর সুন্দর ফল্ল (ফল) খাবো”
“উফ নিনিখ- তুই তো তিতিট জাতির লোকদের মত করে কথা বলছিস- অথচ…”
“অথচ?”
“অথচ আমি তোকে এনেছিলাম ক্যাফুদের কাছ থেকে চুরি করে”
“কি?” অবিশ্বাসী চোখে বাবার দিকে তাকায় নিনিখ।
“হ্যাঁ – আমি তোকে এনেছিলাম ক্যাফুদের কাছ থেকে। চুরি করেছিলাম তোকে”
“কেন?”
“প্রতিশোধ নেবার জন্য” মাথা নিচু করে ফেলে খুমেন।
“কিসের?” অবাক চোখে তাকায় নিনিখ।
“আমার বাবাকে মেরে ফেলেছিল ক্যাফুর সর্দার। আমি চেয়েছিলাম তার ছেলেকে দিয়ে হত্যা করিয়ে তার মাথা হাতে নিয়ে বাবা হত্যার প্রতিশোধ নেব।”
“কেন? কেন এমন করলে বাবা?”
“আমি চেয়েছিলাম আমার সন্তান হবে খুমেনদের মাঝে সবচাইতে হিংস্র- সবচাইতে ক্ষিপ্র-সবচাইতে ভয়ানক। আর তুই হলি উল্টো।”
“বাবা আমার কিছু ভালো লাগেনা- কিচ্ছু ভালো লাগেনা। তুমি আমার বাবা না সেটা আমাকে আগে বলতে পারতে।” বলে কেঁদে কেঁদে চলে গেল নিনিখ সেখান থেকে। তারপর উঠতে শুরু করল একটা বিশাল পাহাড়ে।সেই পাহাড়ে জীবনেও সে উঠতে পারেনি খাড়া হবার কারনে। কিন্তু আজ তার জেদ চেপে গেছে। তাকে আজ কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবেনা। সে এই পাহাড়ের উপর উঠে সোজা নিচে লাফিয়ে পড়বে। লাফিয়ে পড়ে জীবন দিয়ে দেবে।

কিন্তু পাহাড়ের উপর খানিকটা পৌছানোর পর হাপিয়ে উঠল নিনিখ। বুক ধরফর শুরু হল তার। যেখানে ছিল সেখানেই থেমে গেল সে। ওখানেই শুয়ে পড়ল নিনিখ। তারপর ঘুমিয়ে পড়ল দুর্বল হয়ে।

সকাল বেলা গুনগুন একটা শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল নিনিখের।শব্দটা কানে এসে যেন আঘাত করছিল। ঘুম ভেঙ্গে উঠে নিচের দিকে তাকালো নিনিখ।সাথে সাথে দেখতে পেল সে আগুনের লেলিহান শিখা। পুড়ে যাচ্ছে তার গ্রাম। তার ঘরবাড়ি। চিৎকার করে কেঁদে কেঁদেও রেহাই পাচ্ছেনা কেউ। একে একে সবাইকে খুন করে চলেছে সবাইকে ক্যাফুরা। ওদের দ্রুতগামী জন্তু (ঘোড়া) গুলো দিয়ে একে একে খুন করে চলেছে সবাইকে। সাথে সাথে দৌড় দিল নিনিখ। বনবাদার ফুড়ে দৌড় লাগালো সে। হাত পা ছড়ে গেল এখানে সেখানে। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। সে দৌড়ে চলেছে সাম্নের দিকে।

সে যখন নিচে এসে পৌচেছে তখন সব শেষ। ক্যাফুরা চলে গেছে গ্রাম ছেড়ে। পেছনে রেখে গেছে ধবংসস্তুপ। নিজের ঘরের সামনে এসে দেখলো সেখানে মরে পড়ে আছে নুখেন খুমেন-নিনিখের হতভাগ্য বাবা। ক্যাফুরা তাকে প্রথমে হত্যা করেছে। হত্যা করার পর তার শরীরের স্থানে স্থানে ঢুকিয়ে দিয়েছে ধারালো শলা। মরার পর তার মাথার খুলি থেকে ছিড়ে নিয়ে গেছে এক গোছা চুল। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা গ্রামটা দেখে হতবিহব্বল হয়ে গেল নিনিখ। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল সে। কিন্তু সেই কান্না শোনার মত একজন খুমেন ও অবশিষ্ট রইলোনা।

মনের ভেতরে কেমন যেন একটা ক্রোধ জন্ম নিল নিনিখের। সে উঠলো- দৌড়ালো-চিতকার করে কাঁদল- কিন্তু তার বাবা ফিরে এলোনা। জড়িয়ে ধরে আদর করে টেনে নিলোনা বুকের ভেতর।

দুইদিন পর নিনিখের মনে দানা বাঁধল প্রতিশোধ স্পৃহা। সে নিজের কপালে তিলক লাগালো-যেমন করে যোদ্ধা খুমেনরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। শক্ত গাছের ডাল থেকে বানিয়ে নিল একটা কুক্কুর। ধারালো কুক্কির বানালো সে। টাং বানালো শক্ত মজবুত রশি দিয়ে। তারপর এগিয়ে চলল সামনের নদীর দিকে। নদীর ওপাড়েই ক্যাফুদের বসত আছে -সে শুনেছিল তার বাবার কাছে। কিন্তু কোনদিন সেখানে যাবার সাহস হয়নি। আজকে তাকে কেউ আটকে রাখতে পারবেনা। সে রাগে ক্ষোভে ফুসতে ফুসতে এগিয়ে চলল সামনের দিকে।

এদিকে রাত হয়ে গেছে। মাথার উপর উঠেছে উজ্বল চাঁদ। চাঁদের দিকে তাকিয়ে দিক ঠিক করে নিল নিনিখ। তারপর আবার চলতে শুরু করল। চলতে চলতে তার সামনে এসে পড়ল বিশাল এক নদী। নদীকে সারাজীবন ভয় পেয়ে এসেছে নিনিখ। কিন্তু আজকে কোন ভয় কাজ করছেনা তার মাঝে। সে এগিয়ে চলেছে। নদী পাড় ও হয়ে গেল সে সাঁতার কেটে। তারপর নদীর পাড়ে উঠে ধীরে ধীরে হাটা শুরু করল।

কিন্তু তার সামনে অদ্ভুত ভাবে জেগে উঠল লম্বা লম্বা ঘাস। এ ঘাসগুলো সে জীবনেও দেখেনি তাদের গ্রামে। ঘাসগুলোর মাথায় বিশাল আকারের সাদা ফুল ফুটেছে। অন্ধকারে জ্বলছে সেগুলো। সুন্দর ফুল গুলো দেখে যেন হারিয়ে গিয়েছিল নিনিখ। কিন্তু সামান্য পরেই সৎবিৎ ফিরে পেলো সে। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করল নিনিখ। হাতে তার ধারালো কুক্কুর। চোখে জিঘাংসা। সামান্য কিছু পরেই তার সামনে যেন এসে দাঁড়ালো পুরো একটা গ্রাম। ক্যাফুদের গ্রাম। নিরব নিস্তব্ধ একটা গ্রাম। নিনিখের বাড়ির মত এখনেও এখানে সেখানে ডেকে চলেছে ঝিন ঝিন পোকারা। জোনাকি পোকা উড়ে চলেছে এখানে সেখানে। কিন্তু নিনিখের মনে শাক্তি নেই। সে প্রতিশোধের নেশায় যেন পাগল হয়ে গেল।

কিন্তু কিভাবে প্রতিশোধ নেবে বুঝে উঠতে পারলোনা সে। তার সামনে শখানেক যাযাবর ক্যাফু ঘুমিয়ে আছে। সে শুনেছে ঘুমন্ত মানুষের উপর আক্রমন করা কোন যোদ্ধার কাজ নয়। তাই সে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু খানিক পরেই তার মনে হল- যারা যুদ্ধের নিয়ম মানেনা তাদের সাথে যুদ্ধের নিয়মে যুদ্ধ করার মাঝে কোন কৃতিত্ব নেই। সাথে সাথে নিনিখ উঠে দাঁড়াল। কি মনে করে একটা চকমকি পাথর ঘষে ঘষে আগুন জ্বালালো একটা কুক্কুরের মাথায়। তারপর সেটা মাটিতে গেথে দিল সমস্থ শক্তি দিয়ে। তারপর একের পর এক কুক্কুর আগুনে জ্বলিয়ে জ্বলিয়ে ছুঁড়ে দিতে লাগল টাং এর মাথায় লাগিয়ে সমস্থ শক্তি দিয়ে।

দেখতে দেখতে পুরো গ্রামে আগুন ধরে গেল। আর চিৎকার শুরু করল পরাক্রমশালী ক্যাফু নারী আর শিশুরা। পুরুষেরা যে যেদিকে পারছে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু ঘন লম্বা সাদা সাদা ঘাসের মাঝে আগুন তার লেলিহান শিখা দিয়ে গিলতে শুরু করল পুরো গ্রাম। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে গেল পুরুষ ক্যাফু গুলো। বিষাক্ত ধোয়ায় দম বন্ধ হয়ে ঘরের ভেতর পুড়ে মরল নারী ও শিশুরা। ধীরে ধীরে নিনিখের চোখের সামনে ধবংস হয়ে গেল পুরো গ্রাম। যে একসময় এই গ্রামের – এই গোত্রের অংশ ছিল সেই শেষ পর্যন্ত সামান্য আগুনের শিখায় শেষ করে দিল জনমের বন্ধন চিরজনমের মত।

প্রিয় পাঠক আপনাকে এখন নিয়ে যাব আজ থেকে বিয়াল্লিশ বছর আগের একটি গাঁয়ে।সেখানে একটি ছিমছাপ গাঁয়ে টুকু নামে একটি চরিত্র এখন আপনার সামনে। টুকুর চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লোনা জল। অথচ সে কাঁদতে চাইছেনা। কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন সে কেঁদে ফেলছে। চোখ ঢেকে রেখে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে সে। কিন্তু সে পারছেনা। তার পড়ার বই এ এক নিনিখের গল্প পড়েছিল সে। এক বিখ্যাত লেখকের লেখা এক গল্প। সেখানে আছে নিনিখের সংগ্রামের কথা। বর্বর ক্যাফুদের হত্যার প্রতিশোধ নেবার কথা। কিন্তু সে কল্পনা করতে পারেনি এখন কার মানুষ এতো বর্বর হতে পারে। তার সামনে তার মাকে আর বাবাকে বুকে গুলি করে মেরেছে পাক সেনারা। সামনে যাকে পেয়েছে তাকে খুন করে রেখে গেছে শয়তান গুলো। টুকু কোনভাবেই ভুলতে পারছেনা তার মায়ের মুখ। সন্ধ্যা বেলা সে খেলতে গিয়েছিল বনের ভেতর। তার বাড়ির পাশের বনে সে প্রায় সময় খেলতে যায়। কিন্তু খেলা শেষ হবার আগেই দ্রিম দ্রিম আওয়াজে কান ফেটে যাবার যোগার হল ওর। দৌড়ে ঘরের কাছে এসে দেখে সব শেষ হয়েছে। পাক সেনারা সারা গ্রামে আগুন দিয়ে গেছে। বেঁচে নেই একজন মানুষ ও। ওর চৌদ্দ বছরের ছোট্ট জীবনে এতো লাশ সে একসাথে দেখেনি।

মায়ের কাছে মজার মজার গল্প শুনত টুকু। মা পাঞ্জাবীদের আসার গল্প বলেছিল। বলেছিল তাদের বিশাল ট্যাং আর ভিষন ভয়ানক অস্ত্রের কথা। কিন্তু ওরা যে কতটা ভয়ানক সেটা সে টের পায়নি। এখন ওর খুব কান্না পাচ্ছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। খিদে পেয়েছে ওর। কিন্তু মা নিথর হয়ে পড়ে আছে ঘরের দাওয়ায়। টুকুর বাবা স্কুল মাস্টার গিয়াসউদ্দিনের লাশের উপর মাছি উড়তে শুরু করেছে দেখে সে লাশটাকে টেনে ঘরের বাইরে আনতে চেয়েছিল। কিন্তু লাশের ওজনের সাথে পেরে ওঠেনি সে। তাই মাটিতে বসেই কান্না শুরু করেছে।

হটাত করে উঠে দাঁড়াল টুকু। ঘরের ভেতর বাইরে বলে কিছু নেই- তবে কিছুক্ষন আগেও সেটা ঘর ছিল। সেখানে গিয়ে একটা বটি নিয়ে এল টুকু। ধারালো বটি টা নিতেই বুকের ভেতর এক ঘেন্না জেগে উঠল টুকুর। মা-বাবা-পরিবার হারানোর জিঘাংসার চারা বটবৃক্ষে রুপ নিতে শুরু করেছে ওর। শুনেছিল নদীর পাড়েই একটা সেনা ক্যাম্প আছে ওর। সে নদী বরাবর হাটা শুরু করল। চোখে মুখে শুধুই ছিল প্রতিশোধের নেশা। নেশার ঘোরে সে ভুলেই গিয়েছিল সে ১৪ বছরের কিশোর মাত্র- শিশুর চৌহদ্দি পেরিয়েছে মাত্র মাস কয়েক আগে।

পরেরদিন দৈনিক পাকিস্থান এর পাতায় বড় বড় অক্ষরে শিরোনাম আসলঃ
” এক কিশোরের সাহসিকতায় শত্রু মুক্ত হল খুলনার বেড়াখুল গ্রাম। এক কিশোর মাঝরাতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে একটি সেনা ক্যাম্প। তবে কিভাবে একটা কিশোরের পক্ষে একটা পুরো ক্যাম্পে আগুন দেয়া সম্ভব হয়েছে সে বিষয়ে কেউ কিছু বলতে পারেনি। সবাই ধারনা করছে এটা ইন্ডিয়ার চক্রান্ত……”

এই খবর যখন চাউর হয়ে গিয়েছিল পুরো দেশ- টুকু তখন নিজের জীবনের সাথে বহু আগের সেই নিনিখের জীবনের মিল খুঁজে ফিরছিল। হয়তো এভাবেই ইতিহাসের ঘটনার পুনঃজন্ম ঘটে।

লিখেছেনঃ রাজীব চৌধুরী

 

 

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: