আজ: ২৬শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার, ১০ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি, সন্ধ্যা ৬:১৩
সর্বশেষ সংবাদ
সাহিত্য একাত্তরের নারী কথন

একাত্তরের নারী কথন


পোস্ট করেছেন: মতপ্রকাশ ডেস্ক | প্রকাশিত হয়েছে: ০৩/০৫/২০১৪ , ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: সাহিত্য


আজ কত তারিখ? নিজের অজান্তেই নিজেকে প্রশ্ন করে রীতা। এইখানে আসার পর প্রথম কিছুদিন দিনক্ষণ মনে রাখতে পারলেও এখন আর মনে রাখতে পারে না, হয়তোবা মনে রাখার ইচ্ছাটাই শেষ হয়ে গিয়েছে। সারা হাত পা জুড়ে অসহ্য ব্যাথা, একটু নড়লেই মনে হয় গায়ের পেশীতে কেউ ছুড়ি বসাচ্ছে।  মাঝে মাঝেই অন্য মেয়েদের কাতরানির আওয়াজ আসছে। সবচেয়ে বেশী যন্ত্রণা পাচ্ছে বাচ্চা মেয়েটা, বাড়বার ‘মাগো’ ‘’মাগো’ বলে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অনবরত রক্তক্ষরণে শেষে না মারা যায় মেয়েটি । ওইদিনই তো এলো মেয়েটা। লাল একটা ফ্রক পড়া ছিল, বুকের কাছটায় ঝালর দেয়া। ভয়ে মুখটা এইটুকু হয়ে ছিল। বোধহয় আঁচ করতে পেরেছিল কি হতে যাচ্ছে। মেয়ে জাত তো, বিপদের কথা ঠিকই টের পায়। এইসব ভেবতেই একটা হাসি চলে আসে রীতার। হাসতে গিয়ে ঠোঁটের কাটা যায়গায় টান পড়ে, মুখটা কুঁচকে ফেলে। এক কুকুর তার ঠোঁট কামড়ে দিয়েছে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে না দিলে হয়তো ঠোঁটটা কেটেই ফেলত।
এক পাকিস্তানী ক্যাম্পে আছে রীতা সাথে আরও ২০ টি মেয়ে। এইখানে সবার একটাই পরিচয় সবাই নারী। এখানে কোন মানুষ নেই। রীতার সাথে কয়েকজনের কথা হয়। এরা সবাই সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয় একে অন্যের সাথে। যখন কেউ কেঁদে ওঠে সবাই একসাথে কাঁদা শুরু করে দেয়। সবার কষ্টের জায়গাটা এক কিনা। এদের কেউ হাসতে পারে না এখানে ।হাসিটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। বেঁচে আছে এই ঢের, নেহাত মরতে পারে না। ওড়না বা শাড়িটা থাকলেও হত গলায় ফাঁস দেয়া যেত। গায়ের কাপড়ও খুব বেশী নেই। ঐ কালোমত ডাগর চোখের মেয়েটা নিজের ব্লাউজ গলায় পেঁচিয়ে সিলিঙে ঝুলে পড়ার পর ওরা আর কাপড় রাখতে দেয় না। মরার আগে আগে মেয়েটার ডাগর চোখের নিচে গাঢ় কালি জমে গিয়েছিল, বিড়বিড় করে কি সব বলত। মরার পর খোলা চোখে এক উন্মত্ত ক্রোধ দেখতে পেয়েছিল রীতা, বারবার যেন বলছিল আমার সাথে তোমরা যা করেছ তার ফল তোমরা পাবে । রীতার পরনে এখন শুধু একটা পেটিকোট কালো রঙের। উন্মুক্ত বক্ষ চুল দিয়ে ঢাকা। তার ঘন চুলের কত প্রশংসা করতো পল্লব। পল্লব! কোথায় আছে সে? বেঁচে আছে তো?!

আচ্ছা এখন কি রাত না দিন? এই ঘরটা থেকে কিছু বোঝা যায় না। জানালা আছে তাও পেরেক দিয়ে আটকে রাখা, একটা মাত্র লাইট জ্বলে এখানে। অবশ্য রাত হলে ওরা বুঝতে পারে, ওদেরকে এসে ধরে নিয়ে যায়। প্রথম প্রথম খুব জোর করতো হাত পা ছুঁড়াছুঁড়ি করতো, কষ্টও হত প্রচণ্ড। এখন মরার মত পড়ে থাকে । শেষ হলে সিপাহীরা এসে রেখে যায় । পশুদের অত্যাচারে অনেক মেয়েই এখন ভারসাম্যহীন। কি করছে, কি বলছে কিছুই বুঝতে পারে না। বিড়বিড় করে কথা বলে, একা একাই হাসে, কাঁদে।  তিনটি মেয়ে অন্তঃসত্তা, পাকিস্তানী পশুদের বীজ তাদের পেটে। রীতা ভাবে মেয়েগুলো বাচ্চা জন্ম দিতে পারলে কি বাচ্চাগুলোকে একই ভালোবাসা দিতে পারবে? পারবে হয়তো নারী জাত সব পারে। এতো কষ্ট সহ্য করেও যখন বেঁচে আছে তাহলে সব পারবে।

দরজা খুলে যায়,দুজন সিপাহী কক্ষে ঢুকে কোণার দিকে উলঙ্গ মেয়েটার দিকে এগিয়ে যায়।মেয়েটা হাঁটার শক্তি হারিয়েছে । লম্বা চুল নিতম্ব ছাড়িয়ে নেমে গেছে । দুজন দুপাশ থেকে টানতে টানতে নিয়ে যায়। ওদিন রাতে মেয়েটা আর ফিরে আসে না পরের দিনও না। সবাই বুঝতে পারে জীবনীশক্তি হারিয়েছে মেয়েটি। গোসল করে না অনেকদিন। যদি গোসল করতে পারতো। খুব অস্বস্তি লাগছে রীতার গোসল করে সব কলঙ্ক ধুয়ে ফেলতে চায় যেন। এখানে ওরা অনেকদিন পর পর সবাইকে কোমরে দড়ি বেঁধে সামনের নদীতে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ মেয়েরা ওখানে থাকে নিজেদের যতটা পারে পরিষ্কার করে নেয় যেন সব দাগ, কষ্ট আজকেই ধুয়ে ফেলবে। গোসলের জন্য যখন ওরা নদীর ধারে যায় তখনই কেবল আকাশটা দেখতে পায়। ও আর পল্লব একসাথে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো। পল্লবের দেয়া দিল শাড়িটাই পড়নে ছিল যেদিন ও ক্যাম্পে এলো। সব মনে করতে পারে রীতা। রাতে বাবা মা সবার সাথে খেতে বসতে যাবে এমন সময় দরজায় লাথির শব্দ। মায়ের কথায় রীতা খাটের নিচে ঢুকে পড়ে। বাবা দরজা খুলে দিতেই বাবার কলার চেপে ধরে বলতে থাকে ‘তোমহারা লাড়কা কাহা হ্যাঁয়?’ ও বুঝতে দিপু ভাইয়া মুক্তিবাহিনীতে গিয়েছে এরা তার খোঁজেই এসেছে। বাবা খুব শান্তভাবে বলে জানি না। আবার বলে উঠে ‘ঝুট মাত বোলো, তোমহারা বেটা মুক্তিবাহিনী মে হ্যাঁয়’ এই বলে বাবাকে গুলি করে। ধরা পড়ে যাবার ভয়ে রীতা চিৎকারও করতে পারেনি। একটু পর আর একটা গুলির আওয়াজ সাথে মায়ের চিৎকার । এলাকার রাজাকার গণি মিয়া রীতাকে খুঁজে পায় খাটের নিচে। মা বাবার লাশের উপর দিয়ে টানতে টানতে ধরে নিয়ে আসে ক্যাম্পে। এই ক্যাম্পে কাটানো প্রথম রাতের কথা রীতা কখনোই ভুলবে না। এ জীবন তাকে ভুলতে দেবে না। ক্যাম্পে আনার সাথে সাথে রীতাকে এক কক্ষে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর একজন খাকি পোশাক পড়া লোক এসে তার গায়ের সব কাপড় খুলে রেখে যায়, অনেক ধ্বস্তাধস্তি কাজ হয় না, চুল আর দুইহাত বেঁধে রাখে রীতার। এরপর একজন মেজর এসে খুবলে খায় রীতাকে। এরপর একজন তারপর আর একজন এইভাবে সারারাত সে একটু একটু করে মরতে থাকে। বড় অফিসারদের শেষ হলে আসে সিপাহী রাজাকাররা। বোধশক্তি লোপ পেয়েছিলো রীতার, ২০ ঘণ্টা অচেতন ছিল। সে রাতে কতবার ধর্ষিত হয়েছিল জানে না রীতা। যখন জ্ঞান ফিরে তখন ঠিক মত তাকাতেও পারছে না। তলপেটের নিচে অসহ্য ব্যথা, কেউ মনে হয় ছুড়ি দিয়ে ফালি ফালি করে কাটছে, ঠোঁট, গাল, স্তনে কামড়ের দাগ। তখন বারবার মনে হচ্ছিলো এর থেকে বাবা মায়ের সাথে মরে গেলেই বুঝি ভালো হত।

ঐ বাচ্চা মেয়েটি পরদিন রাতে প্রচণ্ড খিঁচুনিতে হাত পা ছুড়তে ছুড়তে মারা যায়। বারবার মা মা বলে চিৎকার করছিলো। মরে গেলে ওর লাশটি টানতে টানতে নিয়ে যায় বাইরে। এখানে চিকিৎসা জিনিসটা বিলাসিতা। ওদের পাশবিক অত্যাচারের কথা মানুষ জানে কি? ওরা শুধু পাশবিক অত্যাচার করেই ক্ষান্ত হয় না, নিজেদের বিকৃত যৌন রুচিরও পরিচয় দেয়। ওরা শুধু নিরীহ বাঙালী মেয়েদের শুধুমাত্র ধর্ষণ করেই ছেড়ে দেয় নাই অনেক পশু ছোট ছোট বালিকাদের ওপর পাশবিক অত্যাচার করেছে। বালিকা থেকে বৃদ্ধা কেউই রেহাই পায়নি ওদের হাত থেকে। অনেক মেয়েকে ধর্ষণের পর দু পা দুদিকে ধরে টেনে ছিরে ফেলেছে। অনেক মেয়েকে ধর্ষণের পর স্তন, নিতম্বে বেয়োনেট চার্জ করে। অনেক মেয়ের স্তন ছুরি দিয়ে ফালি ফালি করে কেটে ফেলে। যোনী পথ ছুড়ি দিয়ে চিড়ে দিয়ে অমানুষিক আনন্দ করে। অনেক অনেক মেয়েকে জোর করে বাধ্য করতো পাকিস্তানীদের ঔরসে বাচ্চা ধারণ করার জন্য। আবার অনেক সময় অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যাওয়া মেয়েদের ওরা মেরেও ফেলত। বাবার সামনে মেয়েকে, ভাইয়ের সামনে বোনকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে এমনকি ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণ করছে ওরা এবং তাদের দেখতে বাধ্য করত।

দেশের কি অবস্থা? খুব জানতে ইচ্ছে করে রীতার। এই কুঠুরীতে থেকে রীতা কিছুই জানতে পারে না। ভাইয়া,পল্লব যুদ্ধে গিয়েছে। ওরা কি করছে? ওরা কি এই মিলিটারিদের মারছে? আচ্ছা দেশ স্বাধীন হবে তো?! কি করবে স্বাধীন হবার পর মাঝে মাঝে ভাবতে থাকে রীতা। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ঘৃণা করে ও পাকিস্তানী মিলিটারিদের। আবার দরজা খুলে যায় রীতা সহ আরও পাঁচটি মেয়েকে নিয়ে যায়। নিথর হয়ে পড়ে থাকে রীতা অফিসারের নিচে। ঘণ্টা এক পরে রীতা নিজেকে খুঁজে পায় ওদের রুমটায়, আজকে বোধয় জ্ঞান হারিয়েছিল। নড়তে পারে না। স্তন, ঊরুসন্ধিসহ সারা শরীরে অসহ্য ব্যাথা। সারা গায়ে অকথ্য নির্যাতনের দাগ। নড়তে পারছে না, খুব চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। এ অপমান আর নিতে পারছে না। কতক্ষণ কাঁদল মনে নেই রীতার মাথার কাছে কে যেন হাত বুলিয়ে দিলো। চোখ ঘুরিয়ে দেখতেই দেখল কমলাবু। সবচেয়ে বয়স্ক মহিলা এখানের। এখন কমলাবুকেই মা মনে হল রীতার, জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিলো।

এই ক্যাম্পে কয়েকটা মেয়ের সাথে রীতার কথা হয় তাদের মাঝে কমলাবু একজন। কমলাবু দুই সন্তানের জননী। স্বামী মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে । রাজাকারদের সহযোগিতায় ওর বাড়ি যায় মিলিটারিরা, বাচ্চাদুটিকে ওর সামনেই মেরে ফেলে। ওকে কাঁদার সময়টাও দেয় নি হানাদারেরা । গাড়িতে তুলে নিয়ে আসে । গাড়িতেই ওর উপর চলতে থাকে অত্যাচার। এখন ওর জায়গা এই ক্যাম্প।

দীপান্বিতা হিন্দু, সদ্য বিবাহিতা মেয়ে । এখন আর বিবাহিতা নেই, বিধবা। স্বামীর চোখের সামনেই ধর্ষণ করে দীপান্বিতাকে, তারপর গুলি করে মারে তার স্বামীকে আর দীপার জায়গা হয় এই ক্যাম্প।

এখানে আসা প্রতিটা মেয়ের একটি নিজস্ব একটি গল্প আছে। কিন্তু সবারই একটি যায়গায় মিল আছে, এদের সবাই  এ যুদ্ধে কিছু না কিছু হারিয়েছে। দেশ স্বাধীন হলে মানুষ কি দিতে পারবে ওদের দাম? নাকি অস্পৃশ্য বলে ছুড়ে ফেলে দেবে?

হঠাৎ করেই ক্যাম্পে প্রচণ্ড গোলাগুলির আওয়াজ। মুহুর্মুহু গুলি চলছে। সবাই বুঝতে পারে মুক্তিবাহিনী আক্রমণ চালিয়েছে ক্যাম্পে। ওদের সাথে সবচেয়ে চুপচাপ নিজের মত করে থাকা মেয়েটা হঠাৎ দাড়িয়ে যায় হাত উঁচু করে চিৎকার করে বলতে থাকে ‘জয় বাংলা।’ রীতার সারা শরীরে মনে হয় বিদ্যুৎ খেলে যায়। এতো দুর্বলতার সত্ত্বেও সে দাড়িয়ে মেয়েটির সাথে চিৎকার করে বলতে থাকে ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বাংলা,’ একে একে সবকটি মেয়ে ওদের সাথে গলা মেলায়। যেভাবে গোলাগুলি শুরু হয়েছিল ওভাবেই শেষ হয়ে গেল। কিন্তু মেয়েগুলো বার বার বলেই জাছে ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বাংলা,’ আজকে যেন ওদের বলতেই হবে। কিছুক্ষণ পর খুলে যায় রুমের দরজা। অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধারা ঢুকে পড়ে। সব মেয়েদের উলঙ্গ অবস্থা দেখে চোখ নামিয়ে বাইরে চলে যায়। কিছু কাপড় জড়ো করে ওদের দিয়ে যায়।

ক্যাম্প থেকে বেড়িয়ে যেতে থাকে মেয়েগুলি। যাবার আগে একবার পিছন ফিরে দেখে নেয় ক্যাম্পটি। এই স্মৃতি আর মনে করতে চায় না। রাস্তার দিতে হাঁটতে থাকে রীতা। দূর থেকে মাইকে আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে , চারদিকে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান। রীতা হাঁটতেই থাকে। আজকে ওর পুনর্জন্ম হয়েছে। রীতার অনেক কাজ। সব কিছু নতুন করে শুরু করতে হবে। পল্লবটাকেও খুঁজে বের করতে হবে।

 

 

লিখেছেনঃ   হোমায়রা মিরা

 

 

 

Comments

comments

Close
%d bloggers like this: